আবুল হোসেনকে বাঁচাতে সিডনিতে কনসার্ট

অন্তরের সাড়ায়,
হৃদয়ের ডাকে,
জীবন বাঁচাতে,
বাড়াবে তোমার হাত……? 

আবুল হোসেন সহজ সরল, নির্বিবাদী, নিরীহ, নির্ঝঞ্ঝাট এক মানুষ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা ( বর্তমানে কর্মহীন) আবুল একজন স্নেহময় পিতা, একজন প্রেমময় স্বামী, একজন বন্ধুবৎসল প্রিয় মুখ। স্বপ্নের মতই সাবলীল জীবনে হঠাৎ বিপর্যয় হয়ে আবুলকে গ্রাস করল এক মরণ ব্যাধি। দুটি কিডনীই অকেজো হয়ে গিয়ে আবুল এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আবুলের জীবনে নতুন করে আলো ফোঁটার কোন সুযোগ এখন আর অবশিষ্ট নেই। আশার কথা হচ্ছে একজন কিডনি দাতার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে কিডনী দাতা প্রাপ্তি একটি দুরূহ ব্যাপার সেখানে দাতা পাওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র অর্থাভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন করা যাচ্ছে না–ভাবা যায়?

এই পর্যন্ত চালিয়ে আসা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে সে এখন কপর্দকশূন্য। দৈনন্দিন ব্যয়ভার সংকুলান অসম্ভব প্রায় হওয়াতে তাকে চলে যেতে হয়েছে গ্রামের বাড়িতে। কিডনি প্রতিস্থাপনের মত ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানোর আর্থিক সংগতি তার আর নেই। 

সবার সম্মিলিত সহযোগিতাই আবুলকে ফিরিয়ে দিতে পারে নতুন জীবন, বাঁচিয়ে রাখতে পারে একটি পরিবারের স্বপ্ন। একটি জীবন, একটি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় সিডনির স্বনামধন্য শিল্পীদের পরিবেশনায় তহবিল সংগ্রহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আপনার উপস্থিতি একান্তভাবে কাম‍্য।

সরাসরি সাহায্যের জন্যঃ
1. Account Name: SM Haque Sohag- Sumon Zahid & Anwar Hossain.
A/C No: 107-12100057641
A/C Type: Savings 
Bank Name: The Premier Bank Limited
7-9 Kawran Bazar, Dhaka
Swift Code: PRMRBDDHKBR
Routing No: 235262534

2. Bkash:
Sohag: 01927370551
Sumon Zahid: 01713163789

3.Kazi Ashfaqur Rahman & Syeda Tanzeen Fatema
BSB 062217
Account No 10567019
Commonwealth Bank of Australia. 
(Please mention for Abul and your name as reference.
e.g. For Abul/Ashfaq) প্রেস বিজ্ঞপ্তি

স্মৃতির ক্যানভাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

প্রেস বিজ্ঞপ্তিঃ প্রানপ্রিয় মানুষের অকাল প্রয়ান প্রতিটি মানুষকে গভীর বেদনার সাগরে ভাসায়। দগ্ধ করে। নি:শেষ করে দেয়। কিছু প্রিয় মানুষের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার সাথে কিছু শিক্ষা নিভৃতে শিখিয়ে দিয়ে যায়।নিরন্তর সে শিক্ষা একান্ত বুকে চেপে জীবনের নিয়ম মেনে নেয়। জীবন বহমান। সকল হারানো কিংবা শোক-তাপের ঊর্ধেও জীবন স্বীয় গতিতে চলবে। এটাই চিরন্তন সত্য। স্মৃতি শুধুই স্মৃতি। কিছু স্মৃতি বড়ই বেদনাদায়ক। কিন্তু স্মৃতিকে যেমন ভূলে থাকা যায় না তেমনি অস্বীকারও করা যায় না।

 এডভোকেট মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার গত ৮ই সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে তিনটায় কারডিয়েক এরেস্টে হাসপাতালে ৬৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তিনি এক ছেলে,দুই মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মোঃ  দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এর  সিনিয়র আইনজীবী  এবং মজুমদার এন্ড ব্রাদারসের প্রোপাইটর। তিনি চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ আওয়ামী বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি ষাটের দশকে ঢাকা  ইউনিভার্সিটির পলিটিকল সাইন্স ও আইনে অধ্যয়নরত অবস্তায় রাজনিতিতে জরিয়ে পরেন।নব্বইয়ের দশকে তিনি পর পর ৩ বার নির্বাচিত জেল ভিজিটর ছিলেন। সেই সময় তিনি প্রথম জেলে ডাল ভাতের সাথে মাছ মাংস সংযোজন করে সবার  আলোচনায় আসেন। তিনি বহুবার চাঁদপুর শাহারসি ৫ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন প্রত্যাশী  ছিলেন।তিনি তার এই জীবনকালে মসজিদ, মাদ্রাসা,স্কুল, ব্রিজ  সহ এলাকার জন্য অনেক কাজ করে গেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মোঃ  দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ১৯৫০ সালে চাঁদপুরের বলাখালে জন্মগ্রহণ করেন। ৪নং কালচোঁ ইউনিউনের মারামুরায় মজুমদার  বাড়িতে তার জন্ম। ব্যক্তিজীবনে নির্মোহ এই মানুষটি যুদ্ধর সময় দেশের জন্য আর যুদ্ধ-পরবর্তী সময় দেশের মানুষের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মোঃ  দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়া বিএনপি, সাবেক মন্ত্রীরা, বাংলাদেশ আওয়ামী বার কাউন্সিল সহ আরও অনেকেই তারা শোকাহত পরিবারের প্রতি সমাবেদনা জানান।  গত ১৮ই অক্টোবর  তার ঢাকার বেইলি রোডের বাসায় এক দোয়ার আয়োযন করা হয়। এতে তার আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী অংশগ্রহন করেন। 

এভাবেই কেটে গেছে এই সরলপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধার জীবন। জীবনের শেষ সময়টা ঢাকার  নিজ রাড়িতে বেশ নিভৃতেই কাটিয়ে দেন তিনি। জীবন থেকে বিদায়ও নেন নীরবেই। নিভৃতচারী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

জীবনের কথামালা

আজকে লিখতে ইচ্ছা করছে পেন্সিল এর এক মডারেটরকে নিয়ে। পেন্সিলের মডারেটর হওয়ার চেয়েও যেটা আমার কাছে আরও অনেক বড় ; সেটা হচ্ছে দীপা আমার ক্লাসমেট (ছিল) এবং বান্ধবী। দীপাকে দীপাবলীও বলা যায়। অন্তত আমার জন্য তো অবশ্যই।

ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া, সেময় আমার জন্য অতি ও অত্যন্ত সহজ কাজ ছিল। সে বিষয়ে তখন বোধহয় আত্মবিশ্বাস আর সাহস ও একটু বেশীই ছিল। আর কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার কোন প্রয়োজনই মনে করি নাই। ভর্তি পরীক্ষায় ২৭তম হলাম। যেকোন বিষয়েই ভর্তি হতে পারতাম। চোখ, মুখ, নাক, কান বন্ধ করে ভর্তি হলাম অর্থনীতিতে। (তখন অর্থনীতি ছিল আমার কাছে খুবই সহজ আর মজার একটা বিষয়।) ভাগ্যিস ভর্তি হয়েছিলাম, তা নাহলে দীপাকে কোথায় পেতাম? ও তো সেই অর্থনীতিতেই ভর্তি হয়েছিল। 

আমাদের ক্লাশে ছাত্র-ছাত্রী ছিল ১২০-১৫০। (রেন্জটা বেশ বড় বুঝতে পারছি কিন্তু এত বছর পর এ্যাকুরেট সংখ্যা বলা মুশকিল হচ্ছে। বন্ধু/বান্ধবদের সাহায্য নিয়ে মিনিমাম-ম্যাক্সিমাম উল্লেখ করলাম)। বিশাল ক্লাস। আমাদের সবার মধ্যে কমন কিছু বিষয় ছিল। সবাই খুব মেধাবী। যে যেখান থেকেই আসুক। প্রচন্ড মেধা তাদের সবার। তার প্রমান দিয়ে তারা অর্থনীতি বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে। ক্লাসের একটা বড় অংশ ছিল বিভিন্ন বোর্ড থেকে মেধা তালিকায় স্ট্যান্ড করা।সবাই খুব সিরিয়াস টাইপ। এমনকি দুষ্টু ছেলেমেয়ে গুলিও খুব সাবধানে কাউকে বিরক্ত না করে দুষ্টুমি করে। প্রায় সবাই বয়সের তুলনায় বেশী গাম্ভির্য দেখিয়ে ফেলত। এসবের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভূত কমন বিষয়টা ছিল গ্রুপ হয়ে চলা। কেউ নিজের গ্রুপ ছাড়া অন্য কারো সাথে তেমন একটা কথাবার্তাও বলত না।গ্রুপের বাইরে পূর্ব পরিচিত হলে কিছু কথাবার্তার চল ছিল। সবার সাথে কথা বলছে এরকম কাউকে খুঁজে পাওয়া ভার।

শুরু থেকেই নানারকম গ্রুপ তৈরী হয়ে গেল। সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডদের গ্রুপ, একই স্কুলে-কলেজে পড়াদের গ্রুপ, ঢাকার বাইরে থেকে আসাদের হল ভিত্তিক গ্রুপ, দুষ্ট ছেলেদের গ্রুপ, দুষ্টু মেয়েদের গ্রুপ, মুখচোরা ছেলে এবং মেয়েদের আলাদা গ্রুপ। 

বলা বাহুল্য, আমিও একটা গ্রুপে বিলং(belong) করতাম। সদস্য ছিলাম মুখচোরা মেয়েদের গ্রুপের। সেসময় আমি ছিলাম পুরোপুরি মুখচোরা (এখন আংশিক)। আমি খুব মুখচোরা হলেও কিভাবে বা কেন যেন মানুষ আমার সাথে  নিজে থেকে আগ্রহ নিয়ে কথা বলত এবং এখনও বলে। আল্লাহ তাদের ভাল করুন। (ভাগ্যিস এরকম মানুষ আছে। তা নাহলে আমি একা একাই জ্বীনের মত ঘুরে বেড়াতাম।)

আমি এবং আমার বান্ধবীরা নিজেদের মত থাকি। আমাদের এমন একটা ভাব, “আমরা তোমাদের দিকে তাকাই না। প্লীজ তোমরাও আমাদের দিকে তাকাবা না” ব্যক্তিগত ভাবে আমার অবস্হা অনেকটা এরকম যে পারলে টেবিলের তলায় বসে থাকি যেন কেউ আমাকে না দ্যাখে। আমার সুপার উইমেনও হতে ইচ্ছা করত। ইনভিজিবল উইমেন জাতীয় কিছু একটা।

এবার আসি দীপার কথায়। দীপা স্বভাবের দিক থেকে আমার উল্টা। সবার সাথে কথা বলত, হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকত। সহজ, সাবলীল হাসিখুশী একটা মেয়ে। সবার সাথে এমন ভাবে মিশত যে এমনকি এটাও মনে করতে পারছি না যে দীপা কোন গ্রুপের সদস্য ছিল কিনা। আমি মুখচোরা হলেও চোখ তো খোলাই থাকত। দীপাকে দেখতাম সবার সাথে। ওর ঘটনাটা কি বুঝতে পারতাম না। ও সবার সাথে কি করে তাও এক রহস্য!?

ফার্ষ্ট ইয়ারে শেষের দিকে অথবা সেকেন্ড ইয়ারের শুরুর দিকে দীপা আমাকে আবিষ্কার করে ফেলল। দীপা যেহেতু সবার সাথে মিশত ওর পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না যে আমার সাথে অনেক সময় কাটাবে। তাছাড়া তেমন কোন কারনও ছিল না আমার সাথে অনেক সময় কাটানোর। মাঝে মাঝে ওর সাথে কথা হোত। মাঝে মাঝে কথা বলা থেকেই বুঝতাম, দীপা সবার থেকে আলাদা। ওর সবার থেকে আলাদা হওয়ার একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। 

দীপা মাঝে মাঝে পাবলিক বাসে উঠত। পাবলিক বাসে উঠা কি রকম ঝক্কি ঝামেলা সেটা ভুক্তভোগীরাই জানে। মানুষের তৈরী করা কিছু যন্ত্রনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য দীপা হাতে ছুরি রাখত। বিল্ডাররা যে ছুরি ব্যবহার করে সেটা। ওর ছুরিটা ছিল স্ন্যাপ অফ ব্লেড (Snap off blade knife)। নীরিহ ধরনের এ ছুরিটা একটু খুললেই আর নীরিহ থাকে না। দীপা সেটাকে কিছুটা খুললেই বাসের গেট ওর জন্য পরিষ্কার।সব নষ্ট মানুষ গুলি তখন বেশ কিছুটা কষ্ট নিয়ে হলেও ক্ষনিকের জন্য ভাল হয়ে যেত। ওঁকে কিছুই করতে হোত না। হাতে শুধু ছুরিটা ধরে রাখা। দীপা সেফ অ্যান্ড সিকিউর। এরকম ভাবনা হয়ত অনেকের মাথায়ই থাকতে পারে কিন্তু এটাকে কাজে পরিনত করা (অন্তত সেসময়) সবার পক্ষে সম্ভব না।

আমাদের, ভার্সিটি তে বন্ধু হয়ে সময় কাটানোর মোট সময়কাল খুবই স্বল্পধৈর্ঘ্য বা বিচ্ছিন্ন ধরনের কারন থার্ড ইয়ারের শুরুতেই আমার একটা এ্যাকসিডেন্ট হওয়ায় মাষ্টার্স এর আগে আমি আর ভার্সিটিতে কোন ক্লাসে যেতে পারিনি। দীপা অবশ্য বাসায় আসত আমাকে দেখতে। (মাষ্টার্সে আমরা দুজনই কিছুটা অনিয়মিত ছিলাম।)

দীপার ভাষায় ও ছিল দুষ্টু, পাজী আর ফাঁকিবাজ। আসলে ও ছিল খুব স্মার্ট আর বহুমুখী মেধার অধিকারীনি। তবলা বাজাত। সেই সময় তো বটেই এখন পর্যন্ত আমি কোন মেয়ে/মহিলাকে তবলা বাজানোকে প্যাশন হিসেবে নিতে দেখিনি। বর্তমানে দীপার তবলা বাজানোর প্রতিভায় বারবার মুগ্ধ হয় অষ্ট্রেলিয়ার বাঙ্গালী প্রবাসীরা।

দীপা কিছুটা দুষ্টু ছিল এটা স্বীকার না করলে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু ওর দুষ্টামি ছিল নির্দোষ ধরনের। দীপার কিছু কথা মনে হলে আমার অন্তরটা হেসে উঠে। বুঝতে পারি আমার ঠোঁটের কোনে হাসি। ও যে শুধু হাসি, ঠাট্টা আর দুষ্টামি বুঝত তা না। আমার এ্যাকসিডেন্টকে কেন্দ্র কর ওঁকে আমি যথেষ্ট সিরিয়াস হতে দেখেছি।

অনার্স পরীক্ষার পর পরই অর্থনীতির ছাত্র-ছাত্রীদের দৌড় শুরু। বি সি এস, উন্নত পড়ালেখার জন্য বিদেশ যাওয়া, বিয়ে করে সংসার গুছানো, প্রাইভেট সেক্টরে চাকরী ইত্যাদি নিয়ে সবাই ব্যস্ত। প্রায় সবার জীবনেই ট্রানজিশন চলছিল। সেসময়টাতে শুরু হলো মাষ্টার্স এর ক্লাস। আমি কিছুটা সুস্হ হলেও চারতলায় উঠানামা খুব কঠিন হয়ে পড়ত। অনিয়মিতভাবে যেতাম। দীপাও কিছুটা ব্যস্ত, অনিয়মিত, হাতে মোবাইল। মোবাইল কনসেপ্ট বাংলাদেশে তখনও নতুনই বলা যায়। ( সেসময় শুধু বিশেষ মানুষরাই মোবাইল ব্যবহার করত।) দীপার হাতের মোবাইল ওঁকে শুধু বিশেষ করেনি সাথে ওর প্রতিভা, মেধা আর স্মার্টনেস এর প্রমানও দিয়েছে। দীপা তখন কাজ করছিল গ্রামীন টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড এর ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে।(৫ বছরের জন্য)।

মাষ্টার্স এর পর সবার ট্রানজিশন আরও বাড়ল। আমরা প্রায় সবাই সবাইকে হারিয়ে ফেললাম ( কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ) দীপা বলে কথা, কয়েক বছর আগে আমাকে ঠিকই বের করে ফেলেছে ফেসবুকে। আমি তো মহাখুশী। দেখা হওয়ার সুযোগ নাই। কঠিন ও ভয়াবহ দূরত্ব। ইংল্যান্ড-অষ্ট্রেলিয়া। তো ফেসবুক ই সম্বল।

দীপার জীবনটা স্বাভাবিক গতিতে চলতে চলতে কঠিন সব ঝড় ঝাপটার মুখামুখি ও হয়েছে। সে অবস্হায় অনেকেই হয়ত জীবনের সব আশা ভরসা ছেড়েই দিত। দীপা তো আর সবার মত না। নতুন করে শুরু করেছে জীবনের গল্প। অনেক কাজ, ব্যস্ততা, মিষ্টি মেয়ে সাফিনা আর স্বামী সংসার দিয়ে সাজানো ওর জীবন। (মাশাল্লাহ।)

দীপার কাজকর্মের লিষ্ট অনেক লম্বা। শুরুটা বলেছি, বর্তমান সময়েরটা বলি। এল জে হুকার (রিয়েল এস্টেট) কোম্পানীতে সিনিয়র প্রপার্টি ইনভেষ্টমেন্ট ম্যানেজার সে। পেশাগত কাজ ছাড়া দীপা বেশ নামকরা তবলাবাদিকা। বিভিন্ন বাংলা অনুষ্ঠানের অর্গানাইজার, শিল্পী, উপস্থাপিকা। তাছাড়াও পেন্সিলের একজন মডারেটর।

কিছুদিন আগে দীপাই আমাকে পেন্সিলের সাথে পরিচিত করেছে এবং সেই সূত্র ধরে আজকে আমার পেন্সিলে লেখা। দীপা এবং দীপার মত দীপাবলীরা আল্লাহর রহমত, বরকত আর আশীর্বাদ এর মধ্যে থাকুক সারাজীবন।আমীন।

লেখকঃ তাসনুভা সোমা

ইংল্যান্ড প্রবাসী

কি ভাবে এত কম সময়ে শেয়ার বাজারে এত ‘লস’ বা এত ‘লাভ’ হয়?

আমিও শেয়ার মার্কেট বা শেয়ার বাজারের এত ‘কম সময়ে বেশী লাভ বা বেশী লস’ এর বিষয়টা তেমন বুঝি না। দয়া করে কেউ কি বুঝিয়ে দেবেন, কি ভাবে এত ‘কম সময়ে শেয়ার বাজার থেকে শেয়ারে ক্ষুদ্র (১০ লাখ থেকে ১০০ লাখ টাকা) বিনিয়োগকারীরা সপ্তাহে সপ্তাহে হাজার হাজার টাকা লাভ প্রত্যাশা করে?? কি ভাবেই বা এত হাজার হাজার কোটি টাকা শেয়ার মার্কেট থেকে উধাও হয়ে যায়???

তবে, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যান আর অভিজ্ঞতা বলে, শেয়ার বাজার হচ্ছে এক ধরনের ‘কারসাজি’র খেলা! আর, শেয়ার মার্কেট সব দেশেই ‘জুয়া’ খেলার মত একটা ‘খেলা’।  এতুটুকু বুঝি এবং দেখেছি যে, শেয়ার বাজারের ‘খেলার মারপ্যাঁচ’ ও জটিল কুটিল বিষয় গুলি ভাল ভাবে  না জেনে, না বুঝে ‘খেলতে নামলে’ বিপদ বা লোকসান অনিবার্য। বাংলাদেশে কেন পৃথিবীর অনেক দেশে তাই হয় এবং হচ্ছে।

একটি বাস্তব উদাহরণ দেই, আমরা যেমন মাছ ধরার আগে পুকুরে মাছের খাবার বা “টোপ ” বা “আধার ” ফেলি, মাছ গুলোকে এক বিশেষ জায়গায় আনতে। তেমনি ভাবে, শেয়ারবাজার এর “কারিগর”রা এই ধরনের “টোপ ” ফেলে ২ বা ৩ সপ্তাহ বা আরো কিছু বেশী সময় ১০০০% থেকে ৫০০০% লাভ (কৃত্তিম ভাবে শেয়ার এর দাম বাড়িয়ে) দিয়ে লোভে ফেলে তাদের “শিকার” ধরে।

শেয়ার বাজার যদি অন্যান্য ব্যাবসার মত বা অঙ্কের মত ২ +২ = ৪ হয়  তাহলে কেউ শেয়ার বাজারেও “আসবে” না আর শেয়ার বাজারও “জমবে” না। এই চরম সত্যটা আমি ১৯৯৮ সালে (ICB ইউনিট বিক্রি করে) প্রায় ১০ লক্ষ টাকা শেয়ার মার্কেটে এ বিনিয়োগ করে পুরো টাকাটা খুইয়ে এই নির্মম সত্যটি বুঝেছি।

কারসাজির মাধ্যমে বাজার থেকে পাকা খেলোয়ড়রা কোটি কোটি টাকা লোপাট করে এবং করতেই থাকবে। শেয়ার মার্কেট এ বিনিয়োগ করে হাজার লক্ষ কোটি টাকা (লাভ) এত কম সময়ে কোত্থেকে আসবে?

এক জনের টাকা আরেক জনের পকেটে যায়। কাজটি সম্পূর্ণ বা আংশিক ‘অনৈতিক’। কিন্তু বেআইনী কী? আমি এখনও জানি না বুঝিও না। আমরা সব্বাই জানি যে, মুসলমানদের জন্য ব্যাঙ্কের সুদ খাওয়া ও সুদ দেওয়া এবং এই সুদ এর সাথে জড়িত থাকাও চরম অনৈতিক এবং ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিশাল গুনহার কাজ।

কিন্তু তারপরেও কি কোটি কোটি মুসলমানরা এই সুদের (“রিবা”র) সাথে জড়িত না?  মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে সুদী ব্যাংক নেই?? আছে এবং বেশ ভাল ভাবেই আছে। কারন ব্যপারটি ধর্মীয় ভাবে অনৈতিক ও হারাম হলেও  কোন দেশেই তা বেআইনী নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে না।

এমনকি পৃথিবীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এই আধুনিক বা সুদী ব্যাঙ্কিং পদ্ধতি শুধু চলমানই না। ঐ সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বেশ গুরুত্তপূর্ণ ও বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্র বা/ও বড় বিনিয়োগ কারীদের নিকট আমার বিনীত জিজ্ঞাসা, এত কম কস্ট করে, কয়েক লক্ষ (বা কয়েক কোটি) টাকা দিয়ে, নামী বা বেনামী কোম্পানির কিছু “শেয়ার” কিনে, ঘরে বা অফিসে বসে যদি প্রতিদিন বা প্রতি মাসে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ  টাকা লাভ বা পাওয়া যেত তাহলে, দেশের ছোট বড় শিল্পপতিরা আর ধনীরাও আমাদের চেয়ে আরও অনেক বেশী টাকা  (শত বা হাজার) কোটি কোটি টাকার “শেয়ার” কিনে ঘরে বা অফিসে বসে  প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা লাভ নিত বা পেত। কস্ট করে শিল্প-কল কারখানা দিতনা এবং তা কষ্ট করে পরিচালনাও করত না।

তাই যারা এমন কয়েক লক্ষ বা কোটি টাকা দিয়ে কিছু “শেয়ার” কিনে, ঘরে বা অফিসে বসে যদি প্রতিদিন হাজার হাজার বা মাসে লক্ষ টাকা লাভ পাওয়ার আশায় বসে বিনিয়োগ করে তারা আসলেই খুবই লোভী বা বেশী লোভী।

অতি লোভে, তাঁত যেমন নস্ট হয়ে যায় তেমনি অতি লোভ করাও পাপ আর সেই পাপে মৃত্যু ডেকে আনে। এবার আমার নিজের বোকামীর বা অতি লোভের কথা বলছি। আমি সেই ১৯৮৭ সাল থেকে প্রথমে ICB, পরে ICB AMCL (২০০৪ সাল থেকে), Bangladesh Fund এর  Unit Fund (২০১০ সাল থেকে) এ invest করে আজ অবধি বেশ লাভ (ডিভিডেন্ড) পাচ্ছি।

কিন্তু, মাঝ খানে ১৯৯৬ সালের শেয়ার বাজারের ঝটিকা লাভ দেখে এবং ১৯৯৭ সালে শেয়ার বাজারের পতন দেখে ১৯৯৮ সালে ICB এর (ডিভিডেন্ড) লাভ করা টাকা থেকে  প্রায় ১০ লক্ষ টাকা, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেছিলাম এক শেয়ার বাজার ‘বোদ্ধা’র মাধ্যমে।

কিন্তু, কম সময়ে বেশী লাভ করার মানসে শেয়ার বাজার বা শেয়ার মার্কেট এর পুরো জ্ঞান তো দুরের কথা নুন্যতম বা বেসিক জিনিস না বুঝে বিনিয়োগ করে পুরো টাকাটাই খুইয়েছি। সবশেষে  আমাদের অনেকের মত কম সময়ে “বেশী লাভ” পাওয়ার লোভে যারা শেয়ার বাজার বা শেয়ার মার্কেট সম্বন্ধে সঠিক ভাবে ও ভাল ভাবে না বুঝে জীবনের অনেক বা বড় অংশের বা সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে বিশাল লসের শিকার হয়েছেন তাঁদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।

লেখকঃ শফিকুর রহমান অনু

অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড প্রবাসী

আজ রিয়াশার জন্মদিন

আজ ২৭ শে জুলাই, দেখতে দেখতে আমার মেয়েটা আজ আঠারো তে পা দিল। সময় কত দ্রুত চলে যায়, মনে হয় এই তো সেদিন শুক্রবার সকালে দশটায় রিয়াশার জন্ম হলো সিডনি রয়েল প্রিনস আলফ্রেড হাসপাতালে, আমার কোল জুড়ে আসলো আমাদের একমাত্র মেয়ে এবং রাতুলের একমাত্র আদরের বোন। সকুল ছুটির পরে যখন রাতুল শুনলো ওর আদরের একটা বোন হয়েছে, খুশীতে হাউমাউ করে কেদেঁছিল। হাসপাতালে এসে বোনকে চেপে ধরে রেখেছিল, বাসায় যেতে চাইছিল না, আমার সংগে বোনকে নিয়ে হাসপাতালেই থাকবে।

রিয়াশা আমাদের পরিবারের অর্থত আমার বাবা মায়ের প্রথম নাতিন। সেদিন ঢাকায় আমাদের বাসায় ও সবাই যেন ঈদ এর খুশীতে আনন্দিত ছিল। ফোনে যখন খবর পেলো মেয়ে হয়েছে, আমার ছোট  বোন ফোন হাতে নিয়ে খুশীতে হাউমাউ করে কেঁদে বলছিল মেয়ে হয়েছে, আমমা বুঝতে পারছিলেন না কি বলছে ভেবেছিলেন বোধ হয় খারাপ কিছু। এই ছিল সেদিনের অবস্হা।

এক বছরের মেটারনিটি লিভে ছিলাম রিয়াশার চার মাস বয়সে ঐ বছরে নভেম্বর সপরিবারে দুই মাসের জন্য বাংলাদেশে গেলাম পথে সিংগাপুরে তিনদিন থাকলাম। ঐ বছরটা যেন খুশি আনন্দেই কাটছিল প্রতিটা দিন। বাংলাদেশে সবাই অপেক্ষা  করছিল কখন রিয়াশা কে দেখবে, ওর দাদুর বাড়ি নানুর বাড়ি আনন্দের এক মহা বন্যা বয়ে গেল। পাচঁ পাচঁটি নাতির পরে আববা আমমার আদরের নাতিন আসলো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানো নিয়ে সবাই মহা ব্যস্ত হয়ে গেলো।  আমাদের বাসাটা তখন ছিল যমজমাট, আব্বা-আম্মা, দুই ভাই তাদের পরিবার, ছোট দুই বোনের বিয়ে হয়নি তখনো ওরা পড়াশোনা করছে, সবাই একসাথে থাকতো। বাসাটি ছিল এখনকার অপোজিট, খুবই জমজমাট ছিল, বিকাল হলে নানা রকমের নাসতার ধুম পরে যেতো, হৈ চৈ আনন্দ লেগেই ছিল। সময়ের সাথে সাথে জীবনের বিরাট পরিবর্তন।  

 যাই হউক, প্রেগনেনট অবস্থায় আমি যখন ডাক্তার এর কাছে জেনেছি মেয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী, সেদিন থেকেই কেনা কাটা বাচ্চার প্রয়োজনীয় জিনিস যাই কিনতাম  সবই যেন পিংক কালারের হতে হবে, মেয়ের একটা থিম থাকতে হবে।

বাচচারা যখন ছোট ছিল মনে হতো কবে বড় হবে। এখন মনে হয় ছোট ছিল ভালোই ছিল।

আল্লাহ রিয়াশা কে যেন সবসময় সুস্থ ও নিরাপদে রাখেন এবং সৎ আদর্শবান মানুষ হিসাবে জীবনে বেড়ে উঠতে পারে এই প্রার্থনা রইলো আল্লাহর কাছে।

লেখিকা: রওশন পারভীন, সিডনি

গুজব থেকে গণপিটুনি ও অসহ্য নৈরাজ্য

পদ্মাসেতু প্রস্ততকারণ প্রতিষ্ঠানের এক চীনা কর্মকর্তা কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়ার জন্য তার অধীনস্ত বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে বললেন, উই ওয়ান্ট মোর হেড। এখানে হেড বলতে কর্মী বুঝানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশি কর্মকর্তা একধাপ এগিয়ে ‘হেড’ শব্দের অর্থ মাথা বা কল্লা বুঝে মানুষের মাথা সংগ্রহে লেগে গেলেন। আর এভাবে গুজব নামে আজিব শব্দটি ছড়িয়ে পড়লো’ না এটা আবার আপনারা সত্যি বলে ধরে নিয়েন না যে এভাবেই গুজবের জন্ম হয়েছে। এটা একটা স্রেফ জোকস। পদ্মাসেতু নিয়ে কল্লাকাটা গুজব নিয়ে নতুন সৃষ্ট জোকস। হয়তো অনেকে ভাববেন যে এরকম একটা সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে জোকস করছি কেন? ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়।

যাক এবার আসল কথায় আসি। বড় কোনো স্থাপনা তৈরি করতে জলদেবতা বা স্থলদেবতা নাকি মানুষের কল্লা চায়। আর এভাবে কালক্রমে মানুষের অশিক্ষাকে পুঁজি করে একশ্রেণির চতুর মানুষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সমাজে কুসংস্কারগুলো চালু রাখে।

মাঝখানে অবশ্য এধরনের গুজব মানুষ ভুলেও গিয়েছিল। এমনকি যমুনা সেতু বা লালন সেতুর মতো বড় বড় সেতু তৈরির সময়ও এ ধরনের কোনো গুজব শোনা যায়নি। প্রশ্ন হলো তখন কি জলদেবতা ঘুমিয়ে ছিল?

এখন কেন এমন গুজব তৈরি হচ্ছে? এ নিয়ে নানা ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। সব কথার সারমর্ম বিচার করলে এটাই আমার কাছে স্পষ্ট হয় যে, দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করাই আসল উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে। আর এতে তারা সার্থকও হয়েছে। কেননা এপর্যন্ত বেশ কিছু নারী পুরুষ ছেলেধরা গুজবের বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। হয়তো প্রিয়জন হারানোর ব্যথা নয়, দেশের সরকার ব্যর্থ এ সংবাদেই তারা আত্মতুষ্টি পাচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে- ২০১৮ সালে সারাদেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৬।

এর পর আসা যাক এ গুজব ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে কেন? থামানো যাচ্ছে না কেন? এর কারণ হিসেবে মনে হয় এর ফাঁকে কিছু ধুরন্ধর ব্যক্তি নিজ স্বার্থে কিছু প্রতিশোধ নিতে গিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে তার ধরা খেয়েছে আর গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। এতে ডিজিটাল যুগে এ খবর দ্রুত পৌঁছে গেছে মানুষে কাছে। আর এটা আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে বিশেষ করে ১৮ জুলাই ছয় থেকে সাত বছর বয়সী শিশুর কাটা মাথা ব্যাগে নিয়ে ঘোরাফেরা করার সময় নেত্রকোণা শহরের নিউ টাউন এলাকায় অজ্ঞাত এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

গুজবটা এত মানুষের মাথায় জেঁকে বসেছে যে কাউকে সন্দেহে হলেই কোনো কিছু না বুঝেই তাকে উৎসব সহকারে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। আর কিছু মানুষ সেটার ভিডিও করে ফেসবুকে ভিউ বাড়াতে সদা ব্যস্ত।

সর্বশেষ যে হৃদয় বিদারক ঘটনা তা হলো বাড্ডায় তাসলিমা বেগম নামে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন এক অভিভাবককে ছেলেধরা গুজবের তীক্ষ্ণ ছুরিতে ফালা ফালা করে হত্যা করা হয়েছে। তার শিশুদের এতিম করা হয়েছে। এই ঘটনা সবাইকে নাড়া দিয়েছে। 

আবার প্রশ্ন হলো কেন তারা এমন আগ্রাসী হয়ে উঠল। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি আস্থাহীন হলে এমনটা ঘটতে পারে।

যদি কাউকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ হয়েই থাকে, তবে তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার কথা। মানুষের এ বোধ কেন হারিয়ে গেল? তবে কি মানুষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তথা বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না? তারা দেখছে- অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই বিচারের ভার নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে।

সরকার কিছুটা দেরিতে হলেও গুজব ঠেকাতে মাঠে নেমেছে। এখন সামাজিক মাধ্যমে ‘স্ট্যাটাস’ দিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তাই গুজব রটনাকারীদের খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। তারপরও কেন তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না- তা বুঝা যাচ্ছে না। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ সামান্য কিছু কটূক্তি করলে বা কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করা হয়। এ ক্ষেত্রে কেন কালক্ষেপণ করা হচ্ছে?

খুবই সাধারণ একজন জনগণ হিসেবে আমার দাবি, দ্রুত এসব গুজব রটনাকারীকে প্রতিহত করুন। আর রক্ষা করুণ নিরীহ কিছু মানুষের প্রাণ। তা না হলে দায়ভার কিন্তু দেশ পরিচালনাকারীদের কাঁধেই চাপবে।

লেখক: মোমিন স্বপন, সাংবাদিক ও নাট্যকার

জয়তু ফরিদ আহমেদ

ফরিদ আহমেদ কাউসার। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। দেশের বাড়ী সিলেটে। দেশে প্রকৌশলী হিসাবে চাকুরী করে প্রায় ২৭- ২৮ বছর নিউজিল্যান্ডে আছেন। নিউজিল্যান্ডে আসার কয়েক বছর পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি পঙ্গু হয়ে হুইল চেয়ারে চলাচল করেন। তিনি একজন সফল হোমিও প্যেথিক চিকিৎসক।

এই বছরের ১৫ই মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল নূর মসজিদে এক সন্ত্রাসীর  গণ গুলিবর্ষনের ঘটনার সময় তিনি ঐ মসজিদে  উপস্থিত ছিলেন। সশস্ত্র সেই হামলায়  সৌভাগ্য ক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও তার প্রিয়তমা স্ত্রী হোসনে আরা আরও ৫০ জনের সাথে শহীদ হন।

সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তুলে ধরতে হোয়াইট হাউসে তিনিও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার দাওয়াত পেয়েছিলেন। মাত্র কয়েকমাস আগে ঘটে যাওয়া ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলায় তাজা ক্ষত নিয়েই ফরিদ আহমেদ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

কিন্তু সেই হামলায় নিয়ে বিরুপ কোনো  মন্তব্য বা সাম্প্রদায়িক কোন বিষয় উপস্থাপন করা তো দূরে কথা, বরং তিনি  তার স্ত্রী হত্যাকারীকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। সেই জঘন্য হামলার পর মুসলমানদের  প্রতি সহমর্মিতা  প্রকাশের জন্য ও সহযোগিতামূলক মনোভাবের জন্য তিনি  নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সহ সরকার, বিরোধী দল, জনগণ সহ বিশ্ববাসীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।  

অন্যদিকে প্রিয়া সাহা নামে বাংলাদেশের এক সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে কিভাবে বা কাদের প্রতিনিধি  হয়ে সেখানে  গেলেন তা এখনও অস্পষ্ট।নিজ মাতৃভূমির বিরুদ্ধে একগাদা মিথ্যা বানোয়াট তথ্য দিয়ে তিনি সেখণে অনেক ভিত্তিহীন  অভিযোগ করে এসেছেন। নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের মাতৃভূমির বদনাম করেছেন।নিজের সামান্য লাভের জন্য বিক্রি করেছেন নিজের দেশের ও নিজ সম্প্রদায়ের মান ইজ্জত।

অথচ সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সুন্দর ও গঠনমূলক বক্তব্য দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করে এসেছেন আরেকজন বাঙ্গালী মুসলিম নিউজিল্যান্ডের বাসিন্দা ফরিদ আহমদ। নিউজিল্যান্ড ফরিদের মাতৃভূমি না হলেও তিনি তাঁর বক্তব্য  কোনোভাবেই তাঁর বর্তমান আবাসস্থলকে, ছোট কিংবা অপমান করেননি।

৮০% শেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের দেশ নিউজিল্যান্ডে আরেক শেতাঙ্গ খ্রিস্টান জঙ্গির নৃশংস হামলার কথা উল্লেখ না করে এবং ঐ ঘটনায়  নিজ প্রিয়তম স্ত্রী হারানোর ব্যথা ও বেদনা ভুলে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাই তুলে ধরেছেন। কারণ তিনি একজন খাঁটী বাঙ্গালী এবং একজন প্রকৃত মুসলিম। এটাই তার দেশপ্রেম, এটাই তার আদর্শ।

ফরিদ আহমদের এমন ভূমিকার আবারো প্রসংশা করেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডান। বলেছেন, ফরিদ আহমেদ এমন একজন মানুষ, যিনি মানবতাকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

জয়তু আমাদের প্রিয় ফরিদ ভাই।

লেখকঃ শফিকুর রহমান অনু

অনারারী কনসাল

অকল্যান্ড নিউজিল্যান্ড

বাংলাদেশে ধর্ষণ পরিস্থিতির জন্যে সরকার কতটুকু দায়ী?

ধর্ষণ, পারিবারিক হিংস্রতা, শারীরিক হিংস্রতা কখনই কোন ভালো সমাজে কাম্য নয়। তবু প্রতিটা সমাজে কিছু মানুষ থাকেন যারা মানসিকভাবে অশান্ত, হিংস্র, সমাজের জন্যে ভাইরাস সমতুল্য। অন্যান্য সমাজ বা দেশের মতো আমাদের দেশেও এগুলা হয় যা কখনই কাম্য নয়। ৯০% মুসলমানের দেশের এটা না হওয়া বা হলেও অত্যন্ত কম হওয়া উচিত। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানের অভাব ও এর চর্চার অভাবে কিছু মানুষরুপী অমানুষ অন্য মানুষের ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়।

অনেকে গত কয়েকদিন ফেসবুকে এইসব ধর্ষণজনিত ঘটনার জন্যে সরকারের সমালোচনা করতে উঠে পরে লেগেছেন। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কেউ কাউকে যৌন আঘাত করলে তার দায় কিভাবে সরকারের উপর বর্তায়? মনে রাখবেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন মেয়ে, একজন মমতাময়ী মা, একজন নানী, একজন দাদী, একজন খালা, ইত্যাদি। উনি কখনই বাংলাদেশে মহিলা বা বাচ্চাদের উপরে হওয়া অন্যায় সহ্য করেন না, করবেন ও না ইনশাল্লাহ।

হ্যাঁ, সরকার অপরাধীদের সাজা দেবে – এবং তা হবে ইনশাল্লাহ। সরকার যদি সাজা দিতে ব্যার্থ হয় তখন সমালোচনা করা যায়। কিন্তু ব্যাক্তি অপরাধ সরকারের উপর চাপিয়ে দেয়ার আমাদের যে চর্চা তা পরিহার করতে হবে। পৃথিবীর সব দেশেই অপরাধ হয়, তার বিচারও হয় কিন্তু আমাদের মতো সব দোষ সরকারের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় না।

যারা বলছেন এই ঘটনার জন্যে সরকার দায়ী – তাদের উদ্দেশ্যে আমার নিচের লিখা। প্লীজ মনে রাখবেন এই লিখার উদ্দেশ্য মোটেই ধর্ষণকে জায়েজ করা না, বরং ধর্ষণজনিত ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশের তুলনা।

২০১৯ এ প্রকাশিত ২০১৬-১৭ সালের পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে এক বছরে প্রায় ৮০২০০ জন যৌন আঘাত বা অভ্যাঘাতের সম্মুখীন হন (https://bit.ly/2G24NNk)। তাছাড়া, ঐ বছরেই প্রায় ৭২০০০ মহিলা, ৩৪০০০ বাচ্চা বিভিন্ন প্রকার পারিবারিক হামলার শিকার হন (https://bit.ly/2FaQ5EA)। এগুলা তো তাও পুলিশের বা অথরিটির কাছে রিপোর্ট করা পরিসংখ্যান।

এক রিপোর্টে এসেছে যে প্রায় ৯১.৬% ধর্ষণ পুলিশে রিপোর্ট করা হয় না (https://bit.ly/2Jr1MJa)। তাহলে এবার বুঝুন কি পরিমান (প্রায় ৭৩ লক্ষ যেখানে কিনা অস্ট্রেলিয়ার জনগনের সংখ্যা আড়াই কোটি) মানুষ যৌন আঘাত বা অভ্যাঘাতের সম্মুখীন হচ্ছেন অস্ট্রেলিয়াতে। এমনকি এক রিপোর্টে (https://bit.ly/2wtIQkq) এটাও বলা হয়েছে যে যৌন আঘাতের ঘটনা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী যেসব দেশে ঘটে তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া অন্যতম তথাপি এখানে শক্ত আইনের অভাবে তাদের শাস্তি হচ্ছে কম বা জেল হচ্ছে কম সময়ের জন্যে। কই কেউ তো এসে এখানে সরকারকে দায়ী করছে না?

তাছাড়া অন্যান্য উন্নত বিশ্বে যদি যান তবে দেখবেন – আমেরিকা, সুইডেন, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডেও ধর্ষণ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশী (https://bit.ly/2Jr1MJa)। সেখানেও তো কেউ এর জন্যে সরকারকে দায়ী করছেন না !! কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি হচ্ছে। তাছাড়া মধ্য প্রাচ্যে তো এর অবস্থা আরো ভয়াবহ। সেখানে কোন মহিলার যেহেতু একা কোথাও যাওয়ার অধিকার নেই, তাই ধর্ষণ হলেও তা রিপোর্ট হচ্ছে না (বেশীরভাগ ধর্ষণ হচ্ছে পরিবারের লোক দ্বারাই)। পারিবারিকভাবে তা চুপ করিয়ে দেয়া হচ্ছে (সম্প্রতি আমি অস্ট্রেলিয়াতে সৌদি আরবের এক পিএইচডি ছাত্রের উপদেস্টা ছিলাম – সেখানে আমি তা দেখেছি)। কই সেটা নিয়েও তো সমালোচকদের খুব একটা আহাজারী করতে দেখা যাচ্ছে না।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই ধরনের প্রতিটা ঘটনার জন্যে বিচার হচ্ছে – যেমনঃ সায়মা হত্যাকান্ডের আসামী হারুনকে সাথে সাথে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2L8YQSQ)

ভালুকায় ধর্ষণ মামলার আসামী গতকাল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে (https://bit.ly/2XCx4jD), বাকিদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ধর্ষণ মামলার আসামী বন্দুকযুদ্ধে নিহত (https://bit.ly/2L7f9iY) হাটহাজারীতে শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামী গ্রেফতার করে আইনের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2YHY8PE)
বরগুনায় রিফাত হত্যার সব আসামী ধরা হয়েছে (নয়ন বন্ড মারা গেছে) এবং বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2XbNn6A)

ঠাকুরগাঁয়ে নার্স তানজিনা হত্যার আসামী ১৪ বছর বয়সী ছেলে জীবনকে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। নুসরাত হত্যা মামলায় থানার ওসিকে পর্যন্ত ছাড়া হয়নি, অন্যদের সবার বিচার হচ্ছে। খাদিজা হত্যা চেষ্টায় ছাত্রলীগ নেতা বদরুলে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে এবং তা ভোগ করতেছে। শিশু রাজন হত্যা মামলার আসামীদের সৌদি থেকে ধরে এনে বিচার করা হয়েছে ইত্যাদি। তাহলে আপনারা কথায় কথায় দেশে বিচার নাই, আইনের শাসন নাই, ইত্যাদি কোথায় পান?

তাই দয়া করে সরকারকে কথায় কথায় দায়ী না করে, আসুন নিজেরা সতর্ক হই। আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, যত্ন নেই, সতর্ক থাকি। প্রয়োজনে গতকাল প্রকাশিত আমার একটা লেখা পড়ে দেখতে পারেন (https://bit.ly/30hTOXy)

বাংলাদেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার অথরিটি বাচ্চাদের ব্যাপারে অন্তত ৫০-৬০ গুন বেশী সতর্ক। তারা প্রায়ই বিভিন্ন স্কুল-কিন্ডার গারটেন-চাইল্ড কেয়ার সেন্টার বন্ধ করে দেয় যদি দেখে সেখানে চাইল্ড সেইফটিতে সমস্যা আছে। এখানে পেডোফাইলদের (যৌন সন্ত্রাসী) লিস্ট আছে যার দ্বারা তারা জেল থেকে ছাড়া পেলেও সমাজে বাচ্চাদের কাছ থেকে তাদের দূরে রাখা হয়। অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত একটা দেশে উচ্চ শিক্ষিত জনগন যদি তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে এতো সতর্ক থাকতে পারে, তাহলে আমরা কেন এতো উদাসীন?

হ্যাঁ সরকারকে এ ব্যাপারে আরো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে (আমি ধর্ষণ আইন আরো কঠোর করা জন্যে অনুরোধ করছি), তবে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব আমরা এড়াতে পারি না !! যদি মনে করেন কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এবং তার বিচার হচ্ছে না, তবে আপনার এলাকার মিডিয়াকে জানান, সংবাদ সম্মেলন করুন, অন্যান্য মিডিয়াকে জানান। একবার এটা মিডিয়াতে আসলে তার বিচারে প্রভাবশালীরা বাঁধা দিতে পারবে না। প্রয়োজনে একটা নিরপেক্ষ মিডিয়া সেল তৈরী করুন – সেখানে এই ধরনের ঘটনা রিপোর্ট করুন। শুধু সমালোচনা না করে, আসুন দেশের জন্যে, সমাজের জন্যে কিছু করি ! সবাই ভালো থাকবেন, আল্লাহ আমাদের সবাইকে (আমাদের, আমাদের বাচ্চাদের, আমাদের মা-বোনদের) হেফাজত করুন। আমিন।

মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক
লেখক: রিসার্চ ফেলো, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়।

সন্তান লালনপালনে পিতামাতার করনীয়ঃ সাম্প্রতিক সময়ের উপযোগী কিছু উপদেশ

বাংলাদেশে সম্প্রতি যেসব ভয়াভহ ধর্ষণ ও খুনের কাহিনী শুনছি তাতে শুধু আমি কেন, পুরো জাতি রীতিমতো উদ্বিগ্ন।দ্রস্টান্তমুলক শাস্তির দাবী, শোক ও নিন্দা জ্ঞাপন তো করা যায়ই, কিন্তু এ থেকে পরিত্রানের উপায় নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। Prevention is better than cure (নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ বা সতর্কতা ভালো)। তাই আমি মনে করি যদি আমরা কিছু নিয়ম মেনে চলি তাহলে হয়তো এই ধরনের ক্ষতি খুব কম হবে ইনশাল্লাহ।

(১) উন্নত দেশের মতো (যেমন অস্ট্রেলিয়া) কখনও আপনার বাচ্চাকে (ছেলে হোক, মেয়ে হোক, একই নিয়ম) (অন্তত পক্ষে ০-১৬ বছর পর্যন্ত) একা কোথাও ছাড়বেন না, যেতে দেবেন না, বা পাঠাবেন না। বিশেষ করে বাজারে বা দোকানে বা স্থানীয় খেলার মাঠে। যদি একান্ত যেতেই হয়, আপনিও সাথে যান।

(২) স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসায় নিজে দিয়ে আসবেন ও নিয়ে আসবেন (স্বামী -স্ত্রী কাজ ভাগ করে নেন)। মনে রাখবেন দুনিয়ার কিছুই আপনার বাচ্চার চেয়ে বেশী মূল্যবান না। স্কুলের নির্ধারিত সময়ের বাইরে স্কুলে যেন কখনও আপনার বাচ্চা একা কারও সাথে না থাকে। একান্ত প্রয়োজন হলে আপনি থাকুন তার সাথে।

(৩) বাসার কাজের লোক বা টিউটরকে চোখে চোখে রাখুন ও তাদের ব্যাবহার লক্ষ্য করুন। শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করে অনেক সময় বাচ্চাকে বলা হয়, এটাই নরমাল, কাউকে বলো না। তাই, বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করুন কেউ তার সাথে এবনরমাল ব্যাবহার করেছে কিনা (কোথাও ছুয়েছে কিনা বা কিছু করেছে কিনা)। জানতে পারলে সাথে সাথে ব্যাবস্থা নিন।

(৪) বাসায় বাচ্চাকে একা রেখে ১ মিনিটের জন্যেও কোথায় যাবেন না। একান্ত যেতে হলে, সাথে করে নিয়ে যান। ১ মিনিটেই অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে (যেমনঃ কিডন্যাপ হয়ে যেতে পারে, অন্য কোথাও নিয়ে ধর্ষণ করতে পারে, ইত্যাদি)।

(৫) কারও (সে যেই হোক – আত্মীয় বা প্রতিবেশী) বাসায় খেলতে বা রাতে থাকতে পাঠাবেন না। যদি একান্ত পাঠাতেই হয় তবে আপনি সাথে যান। যেটুকু সময় সে খেলবে, আপনি লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করুন। রাতে থাকলে আপনিও থাকুন। এমনকি নিজের কাছের আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।

(৬) অন্য যে কারও থেকে আপনার বাচ্চাকে বেশী বিশ্বাস করতে শিখুন। বাচ্চা যদি বলে কেউ তাকে ব্যাথা দিয়েছে তবে তা সিরিয়াসলি নিন। আপনার বাচ্চার উপর আপনি আপনার আত্মীয়, তার শিক্ষক বা মাদ্রাসার হুজুরকে বেশী বিশ্বাস করবেন না (তার শিক্ষার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশী)। বেশীরভাগ শারীরিক লাঞ্চনা অত্যন্ত নিকট আত্মীয়দের দ্বারাই সংগঠিত হয়। সেরকম কিছু চোখে পড়লে সাথে সাথে তাকে এক্সপোজ করুন (সোসাল মিডিয়া, মিডিয়া বা পুলিশে জানান)। নাহলে সে অন্যদের সাথেও এই কাজ করতে থাকবে।

(৭) আপনার বাচ্চার সাথে (তার বয়স অনুযায়ী) গ্রহনযোগ্য ব্যাবহার নিয়ে কথা বলুন। তাকে শিখিয়ে দিতে হবে যে শরীরের কোন অংশেই অন্য কারও স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন অনেকে খেলার ছলে শুধু গালে নয়, শরীরের অন্য জায়গায়ও চুমু খায় – এগুলা ঠিক নয়।  এরকম হলে যেন সে আপনাকে জানায়। তাকে বলতে হবে যে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে তো কোন অপরাধ করেনি। আপনি যদি একবার অযথা আপনার বাচ্চাকে দোষী করেন – যে এগুলা হয়ই, উনি তোমার আঙ্কেল, ইত্যাদি – আপনার বাচ্চা হয়তো জীবনে আর কখনোই আপনাকে কিছু বলবে না।

(৮) আপনার বাচ্চাকে শিখিয়ে দিতে হবে যে কেউ যদি শারীরিকভাবে এসল্ট করে তাকে হুমকি দেয় (এই ঘটনা কাউকে বললে তোমার বাবা-মা কে মেরে ফেলবো, তোমাকে মেরে ফেলবো, বা কুরআন ধরে বলো কাউকে বলবে না, না বললে চকোলেট দিবো, ইত্যাদি) তবুও যেন কিছুই আপনার কাছ থেকে না লুকায়

(৯) আপনার বাচ্চাকে আপনার অনুপস্থিতিতে অন্যদের কাছ থেকে চকোলেট, টাকা, আইসক্রিম ইত্যাদি না নিতে উৎসাহিত করুন। তাহলে সে অন্যদের ট্র্যাপ থেকে বেঁচে যাবে। বেশীরভাল পেডোফাইলরা এগুলার মাধ্যমে বাচ্চাদের কাছে এক্সেস পায়।

(১০) বয়স অনুযায়ী আপনার বাচ্চাকে সুন্দর পরিবেশ দিতে হবে – তাকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে (যেমনঃ তার শরীর কোন লজ্জার বিষয় নয়, বয়ঃসন্ধিকাল একটা নরমাল বিষয়, ইত্যাদি)। তাকে কনফিডেন্স দিতে হবে। তাছাড়া অনেক সময় বাবা-মার ঝগড়ার কারনে অনেক সময় বাচ্চারা ডিপ্রেশনে থাকে। অনেক সময় প্রিডেটররা বাচ্চাদের ডিপ্রেশনের সুযোগ নেয়। ভালো কথায় প্রলোভনে তারা ফেসে যায়। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের সামনে ঝগড়া না করাই শ্রেয়। হয়ে গেলেও পরে বাচ্চাকে সব বুঝিয়ে বলতে হবে।

(১১) সবারই আত্মরক্ষা বিষয়ে জ্ঞান থাকা উচিত। পারলে আপনার বাচ্চাকে আত্মরক্ষা কৌশল শিক্ষা দিন। (যেমনঃ প্রতি সপ্তাহে মার্শাল আর্টস, বা শুধু বাৎসরিক আত্মরক্ষা ট্রেনিং)। একান্ত না পারলে ইউটিউব ভিডিও দেখে শিখে নিতে পারে। আপনি তাকে সাহায্য করুন।

(১২) আপনার বাচ্চা কাদের সাথে মিশছে তা লক্ষ্য রাখুন। সে যেন ড্রাগ এডিক্টেড কারও সাথে না মিশে। তাকে ড্রাগের ভয়াবহতা নিয়ে (বয়স অনুযায়ী) তথ্য দিন। টাকা পয়সা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন। অন্যথায় একবার হয়ে গেলে ফিরিয়ে আনা মুশকিল।

(১৩) আপনার বাচ্চার অনলাইন এক্টিভিটি লক্ষ্য রাখুন। কোনভাবেই যেন সে অনলাইনে বেশী সময় না কাটায়। ১৩ বছরের নীচে বাচ্চাদের মোবাইল ফোন থাকা উচিত না। বাসার কম্পিউটারেও “পেরেন্টাল” অপশন বেছে নিয়ে তার অনলাইন এক্টিভিটি রেস্ট্রিক্ট করে দিন। অনলাইনে যেন সে পর্ণ এডিক্ট না হয়ে যায় বা কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ঘর ছেড়ে না পালায় বা ডেটিং এ না যায়।

(১৪) আপনার বাচ্চাকে মারধর করা থেকে বিরত থাকুন। কোন ভুল করলে বোঝান বা অন্য কোন পদক্ষেপ নিন (যেমনঃ এক সপ্তাহের জন্যে পকেট মানি বন্ধ, গ্রাউন্ডেড (বাইরে যেতে পারবে না), বা তার প্রিয় জিনিষ না দেয়া – একান্ত ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে নটি কর্নার (দুস্ট কর্নার) এলোকেট করে তাকে সেখানে বসিয়ে রাখুন – তার সাথে কথা বার্তা বন্ধ। শাস্তি শেষে তার সাথে আবার ভালো ব্যাবহার করুন। দেখবেন সে বুঝে যাবে কোনটা আপনারা পছন্দ করছেন, কোনটা করছেন না।

(১৫) আপনার বাচ্চাকে কল্যানকর কিছুতে ইনভল্ভ করে দিন যেমনঃ খেলাধুলা, সমাজসেবা (এতিমখানা, পথশিশু, ভলান্টিয়ারিং, ইত্যাদি) বা ক্রিয়েটিভ কিছু (আঁকাআকি, লেখালেখি, কোডিং, বিতর্ক, কবিতা আবৃত্তি, ইত্যাদি)। ভালো মনে করলে, অনলাইনে কুরআন শিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষা নিতে পারে। এতে করে সে অকল্যানকর জিনিষ থেকে দূরে থাকবে।

(১৬) ছোটবেলা থেকেই আপনার বাচ্চাকে ক্যারিয়ারিস্টিক হতে শেখান। পড়াশোনায় ভালো করলে পুরস্কৃত করুন। আপনার কথা শুনলে পুরস্কৃত করুন। ভালো বন্ধু বা বাচ্চাদের সংস্পর্শে রাখুন। দেখবেন বাচ্চা খুব ভালো হয়ে বড় হচ্ছে। 

(১৭) ইন্টারনেটের কল্যানে ওয়েস্টার্ন মিডিয়া বা ভারতীয় মিডিয়ার (এমনকি এখন বাংলাদেশের মিডিয়া) কারনে অনেক বাচ্চাই মনে করতে পারে উচ্ছৃঙ্খলতা নরমাল, উগ্র পোশাক নরমাল, মদ খাওয়া, গাঁজা খাওয়া নরমাল, ডেটিং বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নরমাল, ইত্যাদি। তাদেরকে বোঝান যে এসব ধার্মিকদের ক্ষেত্রে মোটেই নরমাল নয়। তাদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা দিন বা স্বশিক্ষিত করে গড়ে তুলুন, ইনশাল্লাহ তারা সব ধরনের বাজে কাজ থেকে দূরে থাকবে।

সবচেয়ে বড় কথা আপনার বাচ্চাকে ভালোবাসুন, তাকে সময় দিন ও তাকে জানান যে আপনি তাকে ভালোবাসেন। ভালোবাসা প্রকাশ করাও অত্যন্ত জরুরী !! তার সাথে বন্ধুত্ব করুন যাতে সে তার জীবনের সমস্ত ঘটনা আপনার সাথে শেয়ার করে। তার জীবনের সমস্ত ছোট-বড় ঘটনায় আপনি শামিল হোন। তবে অনেক ধরনের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

মোল্লা মো. রাশিদুল হক

লেখক: রিসার্চ ফেলো, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়।