এক ঝাঁক পায়রা

ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ারের ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষের ক্লাস  চলছে।  কিছুক্ষনের মাঝেই বুঝে গেলাম আমি আসলে ভুল সাবজেক্ট পড়তে এসেছি। বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন, আমার আদর্শ। সেই সূত্রে  মনে হয়েছিল আমিও ইকোনোমিক্স পড়ে ব্যাংকে চাকরি করব। 

অথচ আমার অন্তরের আকর্ষণ  সঙ্গীত, চিত্র শিল্প, শিল্পের  অন্যান্য মাধ্যম। ক্লাসে যখন সবাই গভীর মনোযোগে মনোয়ারউদ্দিন আহমেদ স্যারের লেকচার শুনছে,  আমি ছটফট করছি কি মুশকিল চিন্তা করে!

হঠাৎ করে দেখলাম দোতালার ক্লাসরুমের ছাদ অনেক উঁচু। একটু দূরে কয়েকটা খোপের মত ভেন্টিলেশন আছে।  সেই ফাঁকায় কেমন করে যেন একটা সুন্দর সাদা পায়রা এসে বসে আছে। দারুন আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলাম পায়রার খেলা। ভুলেই গেলাম ক্লাসের কথা। এই ছিল আমার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা।

সারাক্ষণ মনের মাঝে অস্থিরতা আর দুষ্টুমি কাজ করতো। সুযোগ খুজতাম কেমন করে ফাঁকি দেয়া যায়, কারণ পড়াশোনায় একদমই মন নেই ।  একদিন খুব সিরিয়াস ক্লাস চলছে।  আমি বুঝতে পারছি না কেমন করে একটু শিথিল হওয়া যায়। 

আমার পাশে বসেছিল রুমানা হক,  আমাদের ক্লাসের পড়ুয়াদের অন্যতম।  আমি সামনে রাখা জ্যামিতি বক্সটা একটু একটু করে ঠেলে হাত দিয়ে নিচে ফেলে দিলাম। সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।  ক্লাসে গুঞ্জন শুরু হল কিছুক্ষনের জন্য।  আমার সে কি আনন্দ!  রুমানা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে! 

ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে আমার ভারি মজা লাগতো।  বন্ধুদের কাছে আমি আমার জীবনে অনেক সহায়তা পেয়েছি।  ওরাই আসলে পরবর্তীতে আমাকে উৎসাহিত করেছে পরীক্ষাগুলো উতরে যেতে।

মাস্টার্স পড়তে পড়তে আমি গ্রামীনফোনে চাকরি শুরু করেছিলাম কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট এর ডেপুটি ম্যানেজার হিসাবে।  ক্লাস করতে পারিনি ঠিকমত। আমি চির কৃতজ্ঞ আমার বন্ধুদের কাছে কঠিন সময় গুলোয় আমার পাশে থাকার জন্য। 

কোন এক অলস দুপুরে তিন তালার বারান্দার অপেক্ষা করছিলাম পরবর্তী ক্লাস শুরু হবার।  হঠাৎ করে দেখলাম পড়ুয়া ছাত্র রবি হেলেদুলে আসছে পিঠে এক বিশাল বড় ব্যাগে বই খাতা ভর্তি। কেন জানিনা বলে উঠলাম,  তুমি ক্লাস ওয়ানে সানফ্লাওয়ার প্রিপারেটরি স্কুলে আমার সাথে পড়তে।  রবি প্রায় উল্টে পড়ে যাচ্ছিলো বারান্দা থেকে চরম বিস্ময়ে। তুমি কি করে জানলে আমি ওই স্কুলে পড়তাম,  বিস্ময় তখনও কাটেনি ওর। স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বললাম,  আমার একটা বন্ধু ছিল ক্লাশে প্রথম হত, ঠিক তোমার মত বিশাল বড় ব্যাগ ভর্তি বইখাতা নিয়ে আসতো আর শুধু পড়াশোনা করত, আমি খুব বিরক্ত হতাম আর রাগ লাগতো এত কেন পড়বে? সেই থেকে মনে হল তুমিই হবে হয়তো! 

চরম উৎসাহ, উত্তেজনা নিয়ে একবার আমরা স্টাডি ট্যুরে চিটাগাং, পতেঙ্গা বিচ , রাঙামাটি গিয়েছিলাম ডিপার্টমেন্ট থেকে। তখন মোবাইল কিংবা ল্যান্ডফোন এত সহজলভ্য ছিল না। রাঙামাটি যখন গিয়েছি যে বাংলোতে আমরা ছিলাম, হঠাৎ করেই ফোন করার সুযোগ পাওয়া গেল। 

রুমানা বললো ও বাসায় ওর মাকে ফোন করবে।  অনেক চেষ্টার পরে কোনোরকমে লাইন মিলল।  ও ফোন করার সাথে সাথে হোটেলের একটা ছেলে পাশে দাঁড়িয়েছিল ক্রমাগত মনে করাতে লাগল এক মিনিট ৬০ টাকা। খানিকটা হাস্যকর ছিল।  খেলার ধারাভাষ্য এর মত বলতে শুরু করল ৫৮ সেকেন্ড ৬০ টাকা… ৪৭ সেকেন্ড ৬০ টাকা… ৩৫ সেকেন্ড ৬০ টাকা… ১০ সেকেন্ড ৬০ টাকা… কথার মাঝখানে হঠাৎ করে রুমানা বলে ফেলল ওর মাকে মা এক মিনিট ৬০ টাকা! তারপর হতবিহ্বল হয়ে ফোনটা রেখে দিল।  রাখার পর খুবই বিরক্ত হয়ে ছেলেটাকে বলল এক মিনিট ৬০ টাকা তো কি?  ছেলেটা বলল আপা এমনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলাম! এমনিতেই ফোনে লাইন পাওয়া দুষ্কর, এভাবে ফোন রাখা দেখে আমি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ছিলাম। 

খুব ছোট ছোট ভালোলাগায় জীবন আনন্দপূর্ণ ছিল তখন। ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ার পড়ার সময় একদিন আমাদের ক্লাসের এক ছেলে ডেকে বলল, আমার সাথে একটু কাঁটাবনে যাবে?  ফুল কিনতে হবে, ঠিক বুঝেনা কোনটা ভালো হবে। নিঃসংকোচে সাথে গেলাম, সবচেয়ে সুন্দর ফুলের তোড়াটা কিনে নিয়ে এলো।  রিকশায় করে ফিরছিলাম দুইজন।  এমন দূরত্ব মাঝে রইল,  যেন ছোঁয়া লাগলে ভয়ানক অন্যায় হয়ে যাবে।

সারা পথে আর কোন কথা হল না। ইউনিভার্সিটি বাসে করে বাসায় চলে আসব, রেজিস্টার বিল্ডিং নেমে গেলাম। ছেলেটা আমাকে অবাক করে বলল ফুলটা তুমি নিয়ে যাও।  আমি অত্যাশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেন?  উত্তরে বলল ভালোবাসি তাই। আমি বললাম আমি এই ভালবাসার প্রতিকৃতি গ্রহণ করতে পারছি না, আন্তরিক  ভাবে দুঃখিত।  ছেলেটা খুব ধীর স্থির স্বরে বলল, এটা নিয়ে আমি কি করব?  তোমার জন্য কেনা।  তুমি এখনি ডিসিশন জানিও না।  ফুলটা নিয়ে বাসায় যাও; যদি তুমি নিজে রাখ তাহলে ধরে নেবো, কখনো কখনো স্বপ্ন সত্যি হয়।  আর যদি অন্য কাউকে দিয়ে দাও, পুরো ঘটনাটা ভুলে যাব আমরা। 

ঐদিন আসলে ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বার্থডে। আমার বান্ধবীকে বাসায় ফেরার পথে অদ্ভুত সুন্দর  ফুলটা দিয়ে এলাম। ফুলের সুন্দর রং আর গন্ধে অনামিকার চমকে যাওয়ায় আমার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেল।

পরের দিন সকালে দেখা হওয়ার সাথে সাথে অনন্তকে বললাম, আমার বান্ধবী খুব খুশি হয়েছে ফুলটা পেয়ে।  কঠিন চেহারায়, গম্ভীর স্বরে বলল এই কাহিনী যদি দ্বিতীয় কেউ জানে খুন করে ফেলব। 

আমি শুধু মুচকি হেসে ছিলাম,  আসলেই আর কখনো বলা হয়নি এই অভিজ্ঞতা। জীবনের মাধুর্য হচ্ছে,  পরক্ষণেই আমরা সত্যি ভুলে গেলাম এমন কিছু কখনো ঘটেছিল।

জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে উপলব্ধি করেছি , পায়রা আসলে আনাচে-কানাচেই রয়েছে সে যত বদ্ধ দুয়ারই থাকুক না কেন।  এখনো শুনতে পাই কিচিরমিচির পাখির মতো আনন্দে মুখরিত সেই দিনগুলোর প্রতিধ্বনি।

সাকিনা আক্তার, সিডনি

সিডনিতে ফয়সাল আজাদ ও তাঁর মায়ের সুস্থতার জন্য ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

করোনায় আক্রান্ত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি ফয়সাল আজাদ এবং তার মাতা লুৎফেয়ারা বেগমের সুস্থতার কামনা করে ১৯ এপ্রিল (সোমবার) তারাবীর নামাজের পর সিডনিস্থ মাস্কট মুসাল্লায় দোয়া করা হয়। এই সময় মাস্কটে অবস্থিত অজ প্রিন্টিং এর পরিচালক মোহাম্মাদ শাহাবুদ্দিন মিয়ার সদ্য প্রয়াত পিতার রূহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন মোহাম্মাদ আহসান ফরায়জী। এসময় সিডনি প্রেস এ্যান্ড মিডিয়া কাউন্সিলের সহ সভাপতি মোহাম্মেদ আসলাম মোল্যা, সাধারণ সম্পাদক মেহাম্মাদ আবদুল মতিন সহ স্থানীয় মুসল্লীরা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও ফয়সাল আজাদ ও তাঁর মা লুৎফেয়ারা বেগমের করোনা আক্রান্ত থেকে আরোগ্য কামনা করে একই সন্ধ্যায় সিডনির ল্যাকেম্বা মাসাল্লায় ইফতার ও দোয়ার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। পবিত্র রমজানের ইফতারের পরে দোয়া পরিচালনা করেন মোহাম্মদ শাহীন ও তারাবীর পর দোয়া পরিচালনা করেন ল্যাকেম্বা মাসাল্লার ইমাম।

দোয়া মাফিলের আয়োজন করেন  হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ এনাম, ইমরান হোসেন, আবু সুফিয়ান মেন্থন, মাসুদুর রহমান, ফখরুল রিয়া, মাহফুজুর রহমান ও ফয়সাল চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন সিডনি প্রেস এ্যান্ড মিডিয়া কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ শামীম, মঞ্জুরুল আহসান ভুলু, নজরুল ইসলাম, শেখ ইসলাম, সোহেল, রুবেলসহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

উল্লেখ্য যে, ফয়সাল আজাদ ও তার মাতা লুৎফেয়ারা বেগম গত ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে সিডনি এসে দুই সপ্তাহের কোয়ারান্টাইনে ছিলেন। এরপর ১১ এপ্রিল করোনা পরীক্ষার পর উভয়ের পজিটিভ রেজাল্ট আসে। বর্তমানে ফয়সাল আজাদ ও তার মা কনকর্ড হাসপাতালের  আইসোলেশনে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।

ফয়সাল আজাদ অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘স্বদেশ বার্তা’র প্রধান সম্পাদক, সিডনি প্রেস এ্যান্ড মিডিয়া কাউন্সিলের সদস্য, সিডনি আওয়ামিলীগের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। আমরা পরম করুনাময় মহান আল্লাহর কাছে ফয়সাল আজাদ এবং তার মমতাময়ী মায়ের সুস্থতা কামনা করছি। ফয়সাল আজাদের সহধর্মিণী সুমি আজাদ তাঁর স্বামী ও শাশুড়ীর জন্য সবার নিকট দোয়া কামনা করেছেন।