টরেন্টো বাংলা স্কুল প্রাবাসে বাংলা ভাষা চর্চার অনন্য এক প্রতিষ্ঠান

মো. নিয়াজ রহমান, টরেন্টো থেকেঃ মায়ের ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারী একমাত্র জাতি হিসেবে যে গর্বের আসনে বাঙালি অধিষ্ঠিত, তা হৃদয় ধারন করে টরেন্টো বাংলা স্কুল আগামী প্রজন্মকেও এই গৌরবের অংশীদার করতে চায়। কানাডায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি শিক্ষা ও চর্চার অনন্য এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশটিতে বসবাসরত বাংলোদেশিদের কাছে সমাদৃত টরোন্টো বাংলা স্কুল। করোনাকালে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার পর গেল দুই সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে এই স্কুলের উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও করোনা সতর্কতার অংশ হিসেবে উপস্থিত সবার জন্য মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেয়া হয়। দীর্ঘদিন পর একসাথে হতে পেরে শিক্ষার্থীরা আনন্দে মেতে উঠে।

২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে এইচ এস ডি এন  ইন্টারন্যাশনাল এর উদ্যোগে টরোন্টো বাংলা স্কুলের  বিনামূল্যে কার্যক্রম শুরু হয়। টরোন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড,  টরোন্টো বাংলাদেশি প্যারেন্ট এ্যাডভাইজরি কমিটি এবং বাংলাদেশি কানাডিয়ান সার্ভিসেস এর সহযোগিতায় কমিউনিটির মাঝে সেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে এটি চালু করা হয়। এর প্রথম কার্যক্রম শুরু হয় ‘অকরিজ জুনিয়র পাবলিক স্কুলে’। শুরুতে টরোন্টো বাংলা স্কুলের ক্লাস পরিচালিত হতো প্রতি রোববার সকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। সেখানে অভিবাভকরাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেন।

বাংলা স্কুলের মূল উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে বাংলা ভাষা শিক্ষা দেয়া এবং কানাডায় বেড়ে ওঠা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। বর্তমানে কানাডার প্রভিন্সিয়াল সরকারের বাজেট সংকোচন নীতির কারণে বাংলা স্কুল স্থানান্তরিত হয়ে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে এক্সেস এ্যালায়েন্স ড্যানফোর্থে। বর্তমানে বাংলা স্কুলের ক্লাসের সময় প্রতি শনিবার বেলা সাড়ে ১১ টা থেকে ২টা পর্যন্ত ।

স্কুলটির উদ্যোগে প্রতি বছর বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস, যেমন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ১লা ফাল্গুন, ১লা বৈশাখ পালন করে থাকে। অন্যদিকে কানাডা ডে, ফ্যামিলি ডে, বিশ্ব পরিবেশ দিবসও পালন করে তারা। প্রতি বছর গ্রীষ্মে সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে বনভোজন ও বারবিকিউ এর আয়োজন করা হয়।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলা স্কুলে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে জুন মাসের শুরুতে। প্রতি শনিবার সময় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টরোন্টো বাংলা স্কুলের মাধ্যমে ৪৫ এরও বেশি কানাডায় জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের প্রাথমিকভাবে বাংলা বলতে, লিখতে ও পড়তে শিখিয়েছে।

বাংলা স্কুলের একটি কার্যকরী কমিটি, একটি উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে এবং একটি বাৎসরিক পরিকল্পনা রয়েছে। উপদেষ্টা কমিটিতে অভিবাভকরা অন্তর্ভূক্ত রয়েছেন। এর মাধ্যমে বাংলা স্কুলের উন্নয়ন, কমিউনিটির সাহায্য সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়।

বাংলা স্কুল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বাচ্চাদের জন্য। যেমন চিত্রাঙ্কন, বাংলা লিখা, রচনা, বাংলা বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। তরুণদের যোগ্য নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়ার্কশপেরও আয়োজন করে থাকে। বাংলা স্কুল প্রতি বছর গুড প্যারেন্টিং শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সকল অভিভাবক ও কমিউনিটির সকলেই অংশগ্রহণ করতে পারেন।

বাংলা স্কুলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে- টরোন্টো বাংলা স্কুলের সেবা বাংলাদেশি কানাডিয়ানদের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বাঙালি এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ডাইভার্সিটি এন্ড হেরিটেজ সেন্টার’ গড়ে তুলা। বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কানাডার মূলধারা সংস্কৃতির কাছে পৌঁছে দেয়া এবং সবাইকে জানানো বাংলা হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র ভাষা, যে ভাষার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ করেছিল এবং শহীদ হয়েছিল, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আান্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পুরো বিশ্ব আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসেবে।

বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার এই গৌরবগাথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s