কৃষ্ণচুড়া

টিপটা কপালের ঠিক মাঝখানটায় পড়েছি। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখে একটু অচেনা লাগছে।  নিজেকে ভালোমতো দেখার সময় হয়নি কখনো সংসার আর কর্মব্যস্ত জীবনের দৌড়ে। 

অজান্তেই হেসে উঠলাম। ইন্টারমিডিয়েট পড়তে কি চঞ্চলা ছিলাম আমি! দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াচ্ছি সারাক্ষণ। গানের স্কুলে শাড়ি পড়ে যেতাম ওটাই ড্রেস কোড ছিল। কলেজে পড়ে মনে হতো পৃথিবীর সবাই আমার ছোট। দোতালার একটা কর্নারে আমার ক্লাস হতো। নিচে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তাকিয়ে দেখি ঠিক পাশেই বেঞ্চে বসে আছে একটা মিষ্টি ছেলে। প্রায় চিবুক ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী পড়ো?  

বলল মাস্টার্স ফাস্ট পার্ট পড়ছি। দৌড়ে পালালাম! কি জ্বালা এ তো আমার থেকে অনেক বড়!  এরপরে আর কোনদিন সামনে পড়িনি। এড়িয়ে পালিয়ে গেছি ভয়ে লজ্জায়। 

কোথা দিয়ে বছর গড়িয়ে ইউনিভার্সিটি উঠে গেলাম। কিছু বন্ধুদের সাথে বসে আছি মাঠে। কেউ গান করছে, কেউ বা গল্প করছে, কারো ব্যস্ততা ক্লাস নোট আদান প্রদানে, কেউ কারো কথা না শুনে হাত-পা নাড়িয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে, গড়িয়ে পড়ছে হাসিতে। শরতের সুন্দর সকাল। নীল আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিক উজ্জ্বল করে। হঠাৎ থেমে গিয়ে, সবাই মিলে তাকিয়ে রইলাম একজন সুদর্শন যুবক ফুল হাতে হেঁটে আসছে আমাদের দিকে। অস্বস্তি বাড়তে লাগল কারণ ছেলেটা আমাদের দিকেই আসছে। ঠিক আমার সামনে এসে ৫০ টা গোলাপ ফুল আমাকে হাত বাড়িয়ে দিল ! আমি নির্বাক তাকিয়ে রইলাম। এই সেই ছেলে যাকে আমি কি পড়াশোনা করছে জানতে চেয়ে পালিয়ে ছিলাম!  

আমি বললাম তোমার ফুলগুলো তো আমি নিতে পারবো না। সে বলল ফুলগুলো তোমার জন্যই আনা আহনা, কি করবো? বন্ধুরা এগিয়ে এল, ফুল গুলো এত সুন্দর নিমেষেই অন্য হাতে চলে যাচ্ছিল। 

আমি খুব অস্বস্তিতে মাঠের পাশে পরে থাকা একটা ঘাস ফুল হাতে তুলে হতচকিত ভাবছিলাম এলোমেলো।

কিছুক্ষণ দাড়িয়ে, ধীর পায়ে সেই যে চলে গেল আর কখনো দেখা হয় নাই।

ভুলেই গেলাম এই সব স্মৃতি। জীবনের কঠিন কিছু সত্য, অনেক ঝড়, উথান, পতন পেরিয়ে একদিন অলস দুপুরে বসে ফেসবুক দেখছিলাম। কিছুদিন হয় ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হয়েছে আমার। নতুন এক চমক। কত বন্ধু, আপন জন ২৫ বছর পর ফেসবুকে খুঁজে পেলাম হঠাৎ করেই। কি আশ্চর্য!  সব কিছু আগের মত রয়ে গেছে, শুধু আমি ছিটকে দূরে হারিয়ে গিয়েছিলাম। 

কেমন করে যেন সেই সূর্য আবার উদয় হল। আমি ফ্রেন্ড   রিকুয়েস্ট পাঠালাম। অ্যাড না করে মেসাঞ্জার এ জানতে চাইল আবার অপদস্থ করতে চাইছি কি না! বললাম না, বিশেষ কোন কারনে নয় অনেক কমন বন্ধু, এমন কি আমার পরিবারের সদস্য আছে তোমার তালিকায় তাই! 

একসেপ্ট করল। 

তেমন কোন কথা হয় না আর। জেনেছি বিয়ে করেনি কারন পছন্দের কাউকে পায়নি আজ অব্ধি।

এক দিন অবাক করা দুটা জিনিশ পেলাম ওর কাছে। 

অনেকগুলো টিপ উপহার দিল, যা আমার এক মাত্র প্রিয় সাঁজ। এক দিন সাদা গোলাপ ফিরিয়ে দিয়েছিলাম,  মাড়িয়ে গেছে অনেকে পাপড়িগুলো অবহেলায়। 

আমার পছন্দের ফুল কৃষ্ণচুড়া। হাতে নিয়েই অনুভব করলাম টিপ মাথায়  করে রাখতে হয়! 

অশেষ বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তখনো। সত্যিকারের ভালবাসার গভীরতা উদাস করে অন্তর। দেখালো ২৫ বছর আগে মাঠে পাওয়া আমার হাতের ওই ঘাস ফুল সযত্নে রেখেছে আজও!

সাকিনা আক্তারঃ সিডনি প্রবাসী লেখিকা

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অনিক সারাফাত আল রহমান