মুখুরিয়াতে খুন

প্রথম পর্ব: ময়মনসিংহের ছোট্ট একটি গ্রাম মুখুরিয়া। শান্ত, চুপচাপ। যেমনটি হয় গল্পে। মানুষজন সহজ সরল। দিনে আনে দিনে খায়, আট পৌরে জীবন। এই ছোট্ট গ্রামটিই ব্যস্ত, চঞ্চল হয়ে উঠল হঠাৎ করে। বাংলা চলচ্চিত্রের হিট নায়িকা সুকন্যার নতুন মুভি “আমার পৃথিবী আমার বেহেস্ত” এর শুটিং লোকেশন গ্রামটি। সবার মধ্যেই উৎসব উৎসব আমেজ। নায়িকাকে সামনা সামনি দেখা যাবে। নায়িকা নাকি ডাবের পানি দিয়ে গোসল করে। তাই যাদের ডাব গাছ ছিল তারা তাদের ডাব গুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছে। কখন লাগে ঠিক আছে নাকি?

নায়িকা সুকন্যা এলেন পরেরদিন। সাথে তার মেকাপ আর্টিস্ট, ক্যামেরাম্যান, সেক্রেটারি, স্ট্যান্ট, ছবির পরিচালক ও প্রযোজক। নায়ক কামরান খান আসেন নি। তার এখানে কোন শুটিং নেই। তাতে কি? লোকজন ভিড় করতে লাগল শুটিং এর আসে পাশে। কিন্তু চেয়ারম্যান কাউকে কাছে ঘেষতে দিচ্ছেন না। লোকজন বলাবলি করতে লাগল নায়িকা সুকন্যা নাকি শুধু মাখন খায়। কেমন মাখনের মত শরীর। নায়িকা আজ শুধু গান শুট করলেন। সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত গেলে প্রথমদিনের শুটিং শেষে সবাই যে যার কাজে চলে গেল। রাতে খাবার সময় নায়িকা সুকন্যার সাথে প্রযোজকের প্রচন্ড ঝগড়া বাধল। তিনি নাকি তার আগের ২টা মুভি সহ এই মুভির টাকা এখনো দেন নি। টাকা না দিলে সুকন্যা এই মুভি শেষ করবে না বলে শাসিয়ে রাখলেন। দেখে নিবেন বলে প্রযোজক উসমান কবীর রাগে গজগজ করতে বেরিয়ে গেলেন।

পরের দিন সকালে পাওয়া গেল সুকন্যার লাশ। বিছানার উপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল তার নিথর দেহ। ঢাকা থেকে এলেন ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের তদন্ত কর্মকর্তা আলী আহসান তালুকদার। এসেই লাশের চারপাশ দেখতে লাগলেন। আইডিয়া করছেন খুন হয়েছে ফজরের সময়। পোস্টমর্টেম করলে এগজ্যাক্ট সময় পেয়ে যাবেন। ধারালো কিছু দিয়ে খুন করা হয়েছে। কিন্তু কাছাকাছি কোন অস্ত্র দেখা যাচ্ছে না। শরীরটা এখনো ভেজা।

খুনের মোটিভ কি এখনো জানা যায় নি। শুটিং আপাতত বন্ধ। সন্দেহের তালিকায় রয়েছে সবাই। স্ট্যান্ট আর্টিস্ট মৌ যার লাভ হবে সবচেয়ে বেশি, নতুন এক্টা মুভি পেয়ে যাবে, প্রযোজক উসমান কবীর যার বাকি টাকাগুলো আর পরিশোধ করতে হবে না, পরিচালক সরোয়ার জাহান মন্টু; যে নায়িকার সুকন্যার কন্টিনিউ ফ্লপ মুভি নিয়ে বিরক্ত, মেকাপ আর্টিস্ট ইকবাল, যে নায়িকার ক্রমাগত বাজে ব্যবহারে বিরক্ত নাকি ক্যামেরাম্যান পাজি হায়াত; গুঞ্জন আছে যার সাথে নায়িকার প্রেমের সম্পর্ক ছিল?

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া গেছে। ধারাল কিছু একটা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। খুন হয়েছে রাত ২-৩ টার মধ্যে। সেভাবেই তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছেন আলী আহসান তালুকদার। তার সন্দেহ উসমান কবীরের উপর। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সাথে তো কাল রাতে ঝগড়া হয়েছিন? শাসিয়েছিলেন? আর আপনার ঘর থেকে এই স্ক্রু ড্রাইভার পাওয়া গেছে। এটা হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা জানতে আমার ২ মিনিট লাগবে। ফরেনসিক টেস্ট করলেই হয়ে যাবে। আপনি কি স্বিকার করবেন নাকি রিমান্ডে নিতে হবে। উসমান কবীর আমতা আমতা করে বললেন, আমি শাসিয়েছি ঠিকই কিন্তু খুন করিনি। রাতে চেয়ারম্যানের অনুরোধে যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানেই ছিলাম ফজর পর্যন্ত। চেয়ারম্যানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেই সত্যতা পাবেন।

নেক্সট পরিচালক সরোয়ার জাহান মন্টু। আপনি তো নায়িকার পারফরম্যান্সে খুশি না। বাদ ও দিতে চেয়েছিলেন। মন্টু বলতে লাগলেন, তার গত কয়েক্টা ছবি একদমই চলে নি। নায়ক কামরান খান ও তার সাথে ছবি করতে রাজি না। অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি। “হৃদয়ের মন্দির”, “আমি, তুমি আর ভালোবাসা”, “বুক ভাংগা ঢেউ” সবগুলো মুভিই অনেক বড় বাজেটের ছিল। লগ্নির টাকাই তুলতে পারি নি। ডন ট্যারা মাসুদ টাকা ইনভেস্ট করেছিল। টাকা দিতে না পারলে সুকন্যাকে বলেছিল তার সাথে একটু সময় দিতে। সে রাজি ছিল না। কিন্তু আমি খুন করি নি। আমি ঘরেই ছিলাম। কি হয়েছিল জানি না।

এমন সময় কনস্টেবল এসে খবর দিল তাকে নাকি পরিচারিকা মাসুমা খবর দিয়েছে সে নাকি রাত সাড়ে ৩ টার দিকে কাকে যেন দৌড়ে বাশ বাগানের দিকে যেতে দেখেছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারে নি। (চলবে)

লেখক: সাব্বির মাহমুদ, সিডনি প্রবাসী