ভিআইপি সংস্কৃতি ও তিতাসের করুণ মৃত্যু

অনেক আগে থেকে একটা জোকস আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, কোনো এক লোককে টিকিট ছাড়া একটু অনুষ্ঠানে প্রবেশের জন্য আটকানো হয়। লোকটি অবাক হয়ে বাধাদানকারীর মুখে দিকে তাকায়। বলে, আপনি জানেন আপনি কার পথ আটকিয়েছেন? আপনি জানেন আমি কে? বাধাদানকারী লোকটি কিছুটা ভড়কে যায়। কিছুটা ভয় নিয়ে ওই দম্ভকারী লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভয়ে ভয়ে বলেন, নাতো, আপনি কে? লোকটি বুক ফুলিয়ে জবাব দেন-আমার ভাইয়ের শ্বশুরের ছেলের সম্বন্ধি দফাদার আমি সরকারি লোক, আমি মোস্ট ভিআইপি। বাধাদানকারী লোকটি ওই ব্যক্তির কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না।

প্রিয় পাঠক, আমরাও বুঝতে পারি না সত্যিকার ভিআইপি কে আর কেনই বা তারা এ সংস্কৃতির চাদর গায়ে দিয়ে দম্ভ দেখায়। কথাগুলো বলার কারণ সত্যিকার কোনো ভিআইপিকে ছোট বা হেয় করার জন্য না। আমাদের জনগণের কষ্টের কথাগুলো বলাই এর উদ্দেশ্য।

আর ভিআইপি সংস্কৃতি নিয়ে বলার প্রাসঙ্গিকতা এই যে, সম্প্রতি মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষকে বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স। ফেরি পার হয়ে ঢাকায় আসতে হবে দ্রুত। তা না হলে যে কোনো কিছু হতে পারে। কিন্তু ঘাট কর্তৃপক্ষ কিছুতেই সময়ের ফেরি সময়ে ছাড়তে পারবেন না। চারদিকে হৈ হৈ, চিংকার চেঁচামেচি। দুর্ঘটনায় আহত তিতাসের মা-বাবার চোখে তখন বিষ্ময়ের অশ্রু। কী করবে বুঝতে পারে না। তিতাসের মা লুটিয়ে পড়ে কর্তৃপক্ষের একজনের পায়ে। ছেড়ে দিতে বলেন ফেরি। তা না হলে তার ছেলেকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু মন গলেনি। তারও চাকরির ভয়। সয়ং ডিসি (উনিও ভিআইপি) সাহেব তাকে নির্দেশ দিয়েছেন সচিব সাহেব ঢাকায় যাবেন। তিনি বিশ্রাম নিয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে ঢাকায় যাবেন। সুতরাং যতো দেরিই হোক আপনার ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া যাবে না। ওই বেচারি আর কি করবে? তারও চাকরির ভয় আছে। ফলাফল- মাথায় রক্তক্ষরণে আহত তিতাস ঘোষের মৃত্যু।

এ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর সেই কমিটি নাকি সেই ডিসির নির্দেশেই হয়েছে যে ফেরি আটকাতে আদেশ দিয়েছিলেন। আর তদন্ত কমিটির ফলাফল কি হবে সেটা তো জনগণ জানেনই।

৩০ জুলাই সকালে নিজের ফেসবুক পেইজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি লিখেছেন, ‘‘রাস্তা কি আপনার? নাকি আপনার বাপ-দাদার? রাস্তা কেন বন্ধ থাকবে আপনার জন্য? ফেরি-রেল-বিমান কি আপনার টাকায় কেনা? কেন থেমে থাকবে এসব আপনার অপেক্ষায়? কেন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কষ্ট পাবে আপনার আরামের জন্য? মানুষের করের টাকায় বেতন পান। আপনার গাড়িতে কেন থাকবে ফ্ল্যাগ?”

এটা তার নিজস্ব মন্তব্য। তিনি দেশের ট্যাক্সধারী একজন জনগণ হিসেবে কথাটা বলতেই পারেন। ফেইসবুক পেইজে ইতোমধ্যে তার হয়ে অনেকে দালালি শুরু করে দিয়েছেন। তিনি নাকি অসুস্থ রোগীর কথা জানলে যেকোনো ভাবে ব্যবস্থা করতেন।

আমার কথা হচ্ছে উনি একজন সাধারণ সচিব পর্যায়ের লোক। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, বিসিএস দিয়ে চাকরি পেয়েছেন এতে সরকারের অনেক ভুর্তকি দিতে হয়েছে আর সেই টাকা তো জনগণের পকেট থেকেই গেছে। আর তিনি যে চাকরি করছেন সেটাও জনগণের সেবার জন্যই করছেন। তো জনগণের সেবক হয়ে তিনি ভিআইপি হন কিভাবে?

অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাহেব ঠিকই বলেছেন। তার মতে, “প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কারো চলার সময়ে এক মিনিটও রাস্তা বন্ধ থাকতে পারবে না। মন্ত্রী পর্যায়ের নীচে কারো গাড়িতে ফ্ল্যাগ থাকতে পারবে না।’’

কথিত ভিআইপিদের কর্মকাণ্ডে মনে হয় গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটাই ঠিক নেই। সবকিছুই নাকি জনগণের জন্যই। জনগণের কল্যাণের জন্যই নাকি সবকিছু পরিচালিত হবে। গণতন্ত্রের সেই বাণীতে আজ নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। এদেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ভিআইপি সংস্কৃতিটির পরিবর্তন হওয়া দরকার। জনগণই যদি আপনাদের মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকে, এই জনগণের ট্যাক্সের টাকাই যদি আপনি ভিআইপি হয়ে থাকেন তো একবার তাদের কল্যাণের জন্য মানবিক হোন। পরিবর্তন করুন সেই পচা মানসিকতার। কারণ একদিন আপনিও জনগণ ছিলেন।

লেখক: মোমিন স্বপন, সাংবাদিক ও নাট্যকার

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s