নিষিদ্ধ স্বপ্ন

আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে জেগে ওঠে সুমিতা। ভোরের পরিষ্কার আকাশ। বাড়ির সদর দরজাটা খুলে গরুগুলো বের করে আটচালায় বেঁধে রাখে। দরজার খুব কাছেই পুকুর পড়ে করবীর গাছ। হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে। বাতাসে ভেসে আসছে সেই করবীর তীব্র গন্ধ। হাত-মুখ ধুয়ে আরতির জন্য প্রস্তুত হয় সুমিতা। মেয়ের ঘরের দরজা পার হতেই মনে পড়ে তার মেয়ের সামনে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। ঘুম থেকে জাগানোর জন্য দরজায় ধাক্কা মারে। দরজা খুলে যায়। ঘর শূন্য। বাথরুমে গেছে ভেবে নিজের ঘরে চলে যায়। 

আরতিতে দেবতার সামনে মেয়ের মঙ্গল কামনা করে আবার মেয়ের খোঁজে তার ঘরে যায়। কিন্তু ঘর আবারো শূন্য দেখে চমকে ওঠে সুমিতা। এত সকালে কোথায় যেতে পারে! এ ভাবনায় তার কপাালে ভাঁজ পড়ে। পুকুর পাড়, বাথরুম এবং আরো বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে সত্যিই ভীত হয়ে ওঠে। দৌড়ে যায় স্বামীর ঘরে। ডেকে তোলে তাকে। কথাটা বলে। কিন্তু ঘুম জড়ানো চোখে তার স্বামী ভবেশ রায় বলে- দেখ, কোথাও আছে। স্বামীর কথায় অরো তৎপর হয়ে সুমিতা আবার কথাটা বলতেই ভবেশের টনক নড়ে। তাহলে মেয়েটা এত সকালে গেল কোথায় ? হাত-মুখ না ধুয়েই বেরিয়ে যায় ভবেশ। সুমিতার জা এর মধ্যে সকালের নাস্তা তৈরির জন্য চুলার পাড়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সুমিতার উদ্বিগ্ন মুখ দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করে-কি হয়েছে সুমিতাদি?
-কিছু হয়নিরে, নন্দাকে পাওয়া যাচ্ছে না। 
-ওমা সেকি কথা, পাওয়া যাচ্ছে না মানে? 
-সকাল থেকে ঘরে নেই। 
কথাটা শুনে আঁচলে হাতমুছতে মুছতে সুমিতার ছোট জা উঠানে ছুটে আসে। সুমিতা ছুটে যায় দেবরের ঘরে। 
-ঠাকুরপো, ও ঠাকুরপো? একবার ওঠো তো।

চোখ ঘুষতে ঘুষতে দীপেন উঠে আসে ঘুম থেকে। বলে- সকাল বেলা এত চিল্লচিল্লি করছো কেন বৌদি? কিছুটা বিরক্তি ঝরে পড়ে দীপেনে মুখ থেকে। আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে সুমিতা যা বলল তা শুনে দীপেনের ঘুম  জড়ানো চোখ স্থির হয়ে গেল। আশ্চর্য হয়ে বলল-কি বলছো বৌদি?

-হ্যাঁ ভাই, সকাল থেকে কত করে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। তুমি একটু যাওনা ভাই। 
দীপেন দেরি না করে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সুমিতা আঁচলে মুখ ঢেকে সেখানেই বসে পড়ে। বড় রাস্তার মাথায় ভবেশের সাথে দীপেনে দেখা। দীপেন ব্যাগ্র হয়ে বলে-খোঁজ পেলে দাদা?
ভবেশ গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলে-না রে!
এর পর দুই ভাই বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পথে কাশেমের সাথে দেখা।ভবেশকে বিমর্ষ দেখে কাশেম বলে-কি ভবেশদা শরীলডা খারাপ নাকি?
-নারে তেমন কিছু না। 

কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। বাড়িতে পা দিতেই সুমিতা একটা চিঠি এগিয়ে দেয় স্বামীর দিকে। দ্রুত চিঠিটা হাতে নিয়ে খুলে পড়তে আরম্ভ করে-‘আমি চলে গেলাম আমার ভালোবাসার কাছে। তোমরা এ সম্পর্ক কোনোদিন মেনে নিবে না জানি।তাই ভালোবাসার জন্য আমাকে সবকিছু ত্যাগ করতে হলো। ইতি – নন্দিতা।

ভবেশ যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। শুধু নিরব কষ্টগুলো ফোটা ফোটা জল হয়ে টপটপ করে ঝড়ে পড়ে চিঠিটার উপর। শব্দ করে কেঁদে উঠে সুমিতা।দীপেশ বৌদিকে ধমক দিয়ে বলে- চুপ করো বৌদি।জানাজানি হয়ে গেলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। একঘরে হয়ে থাকতে হবে। বলেই নিজের ঘরে ঢুকে শার্টটা গায়ে চেপে দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।

দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছোটে। কথাটা নিজেদের দুর্নাম না হলে বুঝতো না দীপেন। বড় রাস্তার মোড়ে যেতেই মুদি দোকানদার ফজর বেশ আগ্রহ নিয়ে দুপা এগিয়ে এসে বলে-দীপেন, খবর কি পাওয়া গেছে?

কথাটার কোনো উত্তর দেয় না দীপেন। শুধু একটা ভাবনা তার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে; তাহলো নন্দিতা সত্যি সত্যি তাদের ছেড়ে চলে যেতে পারলো!ভালোবাসার কী এমন শক্তি যে পিতামাতার রক্তের টান, ধর্মের বাধা কিছুই তাকে আটকাতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে ক’ফোটা চোখের জল গাল বেয়ে ঝরে পড়ে।

বিকেল হওয়ার আগেই ঘটনাটা স্পষ্ট হয় যে, মোবারক মাস্টারের ছেলে পিয়ালের সাথে ভবেশ রায়ের একমাত্র মেয়ে নন্দিতা ভালোবাসার টানে ঘর থেকে পালিয়েছে। কথাটা পাড়া মহল্লার এখন একমাত্র আলোচ্য বিষয়।মুসলমান পাড়ার মাতব্বররা দু’দলে ভাগ হয়ে যায়।একদল ছেলের পক্ষ হয়ে জোরালো যুক্তি তুলে ধরে যে, হিন্দুর কোনো মেয়েকে মুসলমান করতে পারলে সেটা বড়ই ছোয়াবের কর্ম। যেভাবেই হোক ছেলের সাথে মেয়েকে এক করতেই হবে। অপরদল মেয়ের পক্ষ নিয়ে ইতোমধ্যেই হিন্দুপাড়ায় ভবেশ রায়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। তারা পরামর্শ করে কী করে মেয়েকে উদ্ধার করা যায়। বিভিন্ন জায়গায় মোটরসাইকেল দিয়ে ছেলেদের পাঠাতে হবে সুতরাং অনেক খরচার ব্যাপার। 

টাকার চিন্তা করে না ভবেশ। সিন্দুক থেকে বিশ হাজার ক্যাশ টাকা বের করে এনে দেয়। সন্ধ্যার আগেই একজন অপরিচিত লোক কাঁধে ক্যামেরা ঝুলে হাজির ভবেশের বাড়িতে। জানতে চান ঘটনার আদ্যোপান্ত। কী কী ঘটেছিল, কতদিন আগে থেকে সম্পর্ক ইত্যাদি। বাড়ির কারো মুখে কোনো কথা নেই। মাতব্বরের চামচা বেলাল মিয়া ভবেশকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যায়।

-ভবেশদা। লোকটা সাংবাদিক। যাদি পেপারে ছাপায়ে দেয়? তো মান ইজ্জত কিচ্চু থাকপে না। 
অসহায় মুখ নিয়ে ভবেশ তাকায় বেলালের দিকে। 

বেলাল কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলে-বুঝলেন না? উনারে কিছু দিয়া বিদায় করেন। ঝামেলা করে লাভ কি? 
ভবেশ আবারও ক্যাশে হাত দেয়। সন্ধ্যা প্রায় হবে হবে । আরতির শঙ্খ বেড়ে উঠে হিন্দু পাড়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে। কেবল ভবেশের বাড়িতে বিষাদের করুণ সুর । সেই সুর সকল শঙ্খের ধ্বনিকে পরাজিত করে ক্রমাগত আকাশের সীমানার মতো দখল করে এ বাড়ির প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে।

পিয়াল ও নন্দিতা এখন যে গাঁয়ে সেখানেও তাদের অবস্থান জানাজানি হয়ে গেছে। বিষ্ণুপুর নামের ছোট্ট গাঁ। একটি মাটির ঘরের দোতালায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পিয়ালের  এক মামাতো ভাইয়ের শ^শুরের বাড়ি। সারারাত ঘুম নেই দুজনার চোখে। পিয়াল অর্ধশোয়া অবস্থায় নন্দিতার  দিকে মুখ তুলে তাকায়। নন্দিতা চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবছে। 
-নন্দিতা?
-কি?
-আমাদের কি হবে?
-ক্যানো? আমরা বিশ্বাস নিয়ে দুজন দুজনকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছি। 
-তা বুঝলাম।  কিন্তু এর শেষ পরিণতি কি?
-জানি না। তবে এটা জানি আমরা বিয়ে করবো। 
-কিন্তু। 
-অত কিছু বুঝিনা পিয়াল। ভালোবাসার জন্য যে ঘর ছেড়েছি তোমাকে ছাড়া সে ঘরে আর ফিরে যেতে পারবো না। সেটা আমার পক্ষে অসম্ভব। -আমি কিছু ভাবতে পারছি না নন্দিতা। 

ভোরের আলো তখনো ভালোভাবে ফোটেনি। ভারী বুটের অসংখ্য শব্দে চমকে উঠে তারা। একটা অশুভ সংকেত যেন তাদের ঘিরে ধরে। পালাবার জন্য প্রস্তুত হতেই দুজন কালো পোশাকের অস্ত্রধারী র‌্যাব দরজায় এসে দাঁড়ায়। দুজনে একসাথে চমকে উঠে।  আরো একজন র‌্যাব কর্মকর্তা ধীর পায়ে সামনে এসে বলে- ভয় নেই আমাদের সাথে চলো। এর পর র‌্যাবের জিপে তোলে। তখন ভোরের সূর্য উঠে গেছে। পাড়ার মানুষদের মুখে ভয় ও কৌতুহল। তারা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে তাদের দেখছে। সোজা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। 

পিয়াল ও নন্দিতা সেই র‌্যাব অফিসারের মুখোমুখি বসা। একপাশে ভবেশ, দীপেন ও মাস্টার সাহেব বসা।  পিয়াল মাথা নিচু করে বসে আছে। নন্দিতাও। 
অফিসারটি নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলে- দ্যাখ মেয়ে, তোমাদের বয়স এখনো অনেক কম। তোমাদের এখনো বিয়ের বয়স হয়নি।
নন্দিতা চোখে মুখে দৃঢ়তা নিয়ে বলে- আমি পিয়ালকে ভালোবাসি।
-ভালো কথা। ভালোবাসতে তো মানা নেই। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনো এত উদার হয়নি যে তোমাদের এ সম্পর্ক মেনে নিবে। আর তারচে বড় কথা সামনে তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। ভালোবাসার জন্য সেটা নষ্ট করার অধিকার তোমাদের নেই। বড় হও। পড়াশুনা শেষ করো। তারপর দেখা যাবে। 
পিয়াল নির্বাক। নন্দিতার চোখের কোল বেয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রু। 
অফিসার ভবেশ রায়ের দিকে তাকিয়ে বলে-  ভাবেশ বাবু আপনার মেয়েকে নিয়ে যান। মারধর করবেন না। বুঝিয়ে বলবেন। আর মাস্টার মশাই আপনিও আপনার ছেলেকে নিয়ে যান।

বাকরুদ্ধ নন্দিতা যেন কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছে না। তার চোখের বেলাভ’মি ছাপিয়ে অশ্রুরা বাঁধভাঙা নদীর জোয়ারের মতো প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। 
এর পর ঘটনার পাঁচদিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু থামেনি পাড়ায় পাড়ায় আলোচনা-সমালোচনা। নন্দিতার ঘুম, খাওয়া-দাওয়া কিছুই নেই। মেয়ের সাথে সুমিতা দেবীরও একই অবস্থা। 
সমাজপতিরা এটাকে মেনে না নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। সেটা ভয় করেনা ভবেশ। দুচারজন ব্রাহ্মণকে পেট পুরে খাওয়ালেই সে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু তাদের  মেয়ের অবস্থা অশঙ্কাজনক বললেও ভুল হবে না। নন্দিতার কথা  হলো- আমি মনেপ্রাণে এখন মুসলমান। তোমাদের কোনো অধিকার আর আমার প্রতি নেই। 

পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। দীপেন তার বড়ভাইকে পরামর্শ দেয় যে, নন্দিতাকে ঢাকায় তার বড় মামার কাছে পাঠিয়ে দিতে। সেখানে দ্রুত বিয়ের আয়োজন করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। 

নন্দিতাকে জানানো হয় কাল ভোরের ট্রেনে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সব নিস্তব্ধ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সুমিতা মেয়ের মঙ্গলে জন্য ঠাকুরঘরে পড়ে আছে। সেদিন অনেক রাত অবধি তারা পরামর্শ করে কী করে কী করা যায়। তার পর অনেক রাতে ঘুমাতে যায় যে যার ঘরে। সুমিতা যায় তার মেয়ের ঘরে ঘুমাতে। দূরের মসজিদ থেকে আজানের শব্দে জেগে উঠে সুমিতা।মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। কয়েকদিন পর মেয়েকে এমনভাবে ঘুমাতে দেখে মনে শান্তি পায়। দ্রুত রান্নার জন্য ঘর থেকে বের হয়। ভোরের আলো ফুটবার আগেই মেয়েকে পাঠাতে হবে। রান্না শেষ হয়। মেয়েকে ডাকতে ডাকতে ঘরে যায় সুমিতা। 
কোনো সাড়াশব্দ নেই।মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিতেই একদিকে মুখ ঢলে পড়ে। মুখ সাদা ফেনায় ভরা। বুঝতে বাকি থাকে সুমিতার। তার পর আকাশ ফাটানো চিৎকার করে উঠে। সেই চিৎকারে বাড়ির সবাই দ্রুত এসে জড়ো হয় নন্দিতার ঘরে। ভবেশ তার মেয়ে দিকে এগিয়ে যায়। ঢুকরে কেঁদে উঠে। নন্দিতার মুঠোকরা হাতের ফাঁকে তখনো কয়েকটি করবীর বিচি পড়ে আছে। পাশে সাদা কাগজে ভাঁজ করে রাখা চিঠি। লেখা-‘ক্ষমা করো আমায়। ভালোবাসাহীন বেঁচে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়’।

লেখক: মোমিন স্বপন, সাংবাদিক ও নাট্যকার।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s