বাংলাদেশে ধর্ষণ পরিস্থিতির জন্যে সরকার কতটুকু দায়ী?

ধর্ষণ, পারিবারিক হিংস্রতা, শারীরিক হিংস্রতা কখনই কোন ভালো সমাজে কাম্য নয়। তবু প্রতিটা সমাজে কিছু মানুষ থাকেন যারা মানসিকভাবে অশান্ত, হিংস্র, সমাজের জন্যে ভাইরাস সমতুল্য। অন্যান্য সমাজ বা দেশের মতো আমাদের দেশেও এগুলা হয় যা কখনই কাম্য নয়। ৯০% মুসলমানের দেশের এটা না হওয়া বা হলেও অত্যন্ত কম হওয়া উচিত। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানের অভাব ও এর চর্চার অভাবে কিছু মানুষরুপী অমানুষ অন্য মানুষের ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়।

অনেকে গত কয়েকদিন ফেসবুকে এইসব ধর্ষণজনিত ঘটনার জন্যে সরকারের সমালোচনা করতে উঠে পরে লেগেছেন। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কেউ কাউকে যৌন আঘাত করলে তার দায় কিভাবে সরকারের উপর বর্তায়? মনে রাখবেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন মেয়ে, একজন মমতাময়ী মা, একজন নানী, একজন দাদী, একজন খালা, ইত্যাদি। উনি কখনই বাংলাদেশে মহিলা বা বাচ্চাদের উপরে হওয়া অন্যায় সহ্য করেন না, করবেন ও না ইনশাল্লাহ।

হ্যাঁ, সরকার অপরাধীদের সাজা দেবে – এবং তা হবে ইনশাল্লাহ। সরকার যদি সাজা দিতে ব্যার্থ হয় তখন সমালোচনা করা যায়। কিন্তু ব্যাক্তি অপরাধ সরকারের উপর চাপিয়ে দেয়ার আমাদের যে চর্চা তা পরিহার করতে হবে। পৃথিবীর সব দেশেই অপরাধ হয়, তার বিচারও হয় কিন্তু আমাদের মতো সব দোষ সরকারের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় না।

যারা বলছেন এই ঘটনার জন্যে সরকার দায়ী – তাদের উদ্দেশ্যে আমার নিচের লিখা। প্লীজ মনে রাখবেন এই লিখার উদ্দেশ্য মোটেই ধর্ষণকে জায়েজ করা না, বরং ধর্ষণজনিত ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশের তুলনা।

২০১৯ এ প্রকাশিত ২০১৬-১৭ সালের পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে এক বছরে প্রায় ৮০২০০ জন যৌন আঘাত বা অভ্যাঘাতের সম্মুখীন হন (https://bit.ly/2G24NNk)। তাছাড়া, ঐ বছরেই প্রায় ৭২০০০ মহিলা, ৩৪০০০ বাচ্চা বিভিন্ন প্রকার পারিবারিক হামলার শিকার হন (https://bit.ly/2FaQ5EA)। এগুলা তো তাও পুলিশের বা অথরিটির কাছে রিপোর্ট করা পরিসংখ্যান।

এক রিপোর্টে এসেছে যে প্রায় ৯১.৬% ধর্ষণ পুলিশে রিপোর্ট করা হয় না (https://bit.ly/2Jr1MJa)। তাহলে এবার বুঝুন কি পরিমান (প্রায় ৭৩ লক্ষ যেখানে কিনা অস্ট্রেলিয়ার জনগনের সংখ্যা আড়াই কোটি) মানুষ যৌন আঘাত বা অভ্যাঘাতের সম্মুখীন হচ্ছেন অস্ট্রেলিয়াতে। এমনকি এক রিপোর্টে (https://bit.ly/2wtIQkq) এটাও বলা হয়েছে যে যৌন আঘাতের ঘটনা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী যেসব দেশে ঘটে তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া অন্যতম তথাপি এখানে শক্ত আইনের অভাবে তাদের শাস্তি হচ্ছে কম বা জেল হচ্ছে কম সময়ের জন্যে। কই কেউ তো এসে এখানে সরকারকে দায়ী করছে না?

তাছাড়া অন্যান্য উন্নত বিশ্বে যদি যান তবে দেখবেন – আমেরিকা, সুইডেন, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডেও ধর্ষণ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশী (https://bit.ly/2Jr1MJa)। সেখানেও তো কেউ এর জন্যে সরকারকে দায়ী করছেন না !! কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি হচ্ছে। তাছাড়া মধ্য প্রাচ্যে তো এর অবস্থা আরো ভয়াবহ। সেখানে কোন মহিলার যেহেতু একা কোথাও যাওয়ার অধিকার নেই, তাই ধর্ষণ হলেও তা রিপোর্ট হচ্ছে না (বেশীরভাগ ধর্ষণ হচ্ছে পরিবারের লোক দ্বারাই)। পারিবারিকভাবে তা চুপ করিয়ে দেয়া হচ্ছে (সম্প্রতি আমি অস্ট্রেলিয়াতে সৌদি আরবের এক পিএইচডি ছাত্রের উপদেস্টা ছিলাম – সেখানে আমি তা দেখেছি)। কই সেটা নিয়েও তো সমালোচকদের খুব একটা আহাজারী করতে দেখা যাচ্ছে না।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই ধরনের প্রতিটা ঘটনার জন্যে বিচার হচ্ছে – যেমনঃ সায়মা হত্যাকান্ডের আসামী হারুনকে সাথে সাথে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2L8YQSQ)

ভালুকায় ধর্ষণ মামলার আসামী গতকাল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে (https://bit.ly/2XCx4jD), বাকিদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ধর্ষণ মামলার আসামী বন্দুকযুদ্ধে নিহত (https://bit.ly/2L7f9iY) হাটহাজারীতে শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামী গ্রেফতার করে আইনের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2YHY8PE)
বরগুনায় রিফাত হত্যার সব আসামী ধরা হয়েছে (নয়ন বন্ড মারা গেছে) এবং বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে (https://bit.ly/2XbNn6A)

ঠাকুরগাঁয়ে নার্স তানজিনা হত্যার আসামী ১৪ বছর বয়সী ছেলে জীবনকে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। নুসরাত হত্যা মামলায় থানার ওসিকে পর্যন্ত ছাড়া হয়নি, অন্যদের সবার বিচার হচ্ছে। খাদিজা হত্যা চেষ্টায় ছাত্রলীগ নেতা বদরুলে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে এবং তা ভোগ করতেছে। শিশু রাজন হত্যা মামলার আসামীদের সৌদি থেকে ধরে এনে বিচার করা হয়েছে ইত্যাদি। তাহলে আপনারা কথায় কথায় দেশে বিচার নাই, আইনের শাসন নাই, ইত্যাদি কোথায় পান?

তাই দয়া করে সরকারকে কথায় কথায় দায়ী না করে, আসুন নিজেরা সতর্ক হই। আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, যত্ন নেই, সতর্ক থাকি। প্রয়োজনে গতকাল প্রকাশিত আমার একটা লেখা পড়ে দেখতে পারেন (https://bit.ly/30hTOXy)

বাংলাদেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার অথরিটি বাচ্চাদের ব্যাপারে অন্তত ৫০-৬০ গুন বেশী সতর্ক। তারা প্রায়ই বিভিন্ন স্কুল-কিন্ডার গারটেন-চাইল্ড কেয়ার সেন্টার বন্ধ করে দেয় যদি দেখে সেখানে চাইল্ড সেইফটিতে সমস্যা আছে। এখানে পেডোফাইলদের (যৌন সন্ত্রাসী) লিস্ট আছে যার দ্বারা তারা জেল থেকে ছাড়া পেলেও সমাজে বাচ্চাদের কাছ থেকে তাদের দূরে রাখা হয়। অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত একটা দেশে উচ্চ শিক্ষিত জনগন যদি তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে এতো সতর্ক থাকতে পারে, তাহলে আমরা কেন এতো উদাসীন?

হ্যাঁ সরকারকে এ ব্যাপারে আরো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে (আমি ধর্ষণ আইন আরো কঠোর করা জন্যে অনুরোধ করছি), তবে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব আমরা এড়াতে পারি না !! যদি মনে করেন কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এবং তার বিচার হচ্ছে না, তবে আপনার এলাকার মিডিয়াকে জানান, সংবাদ সম্মেলন করুন, অন্যান্য মিডিয়াকে জানান। একবার এটা মিডিয়াতে আসলে তার বিচারে প্রভাবশালীরা বাঁধা দিতে পারবে না। প্রয়োজনে একটা নিরপেক্ষ মিডিয়া সেল তৈরী করুন – সেখানে এই ধরনের ঘটনা রিপোর্ট করুন। শুধু সমালোচনা না করে, আসুন দেশের জন্যে, সমাজের জন্যে কিছু করি ! সবাই ভালো থাকবেন, আল্লাহ আমাদের সবাইকে (আমাদের, আমাদের বাচ্চাদের, আমাদের মা-বোনদের) হেফাজত করুন। আমিন।

মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক
লেখক: রিসার্চ ফেলো, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s